বদলে যাওয়া জলবায়ুতে পাল্টে যাচ্ছে ঋতুর স্বাভাবিক ছন্দ
মো: ইয়াছিন : একসময় ছয় ঋতুর বৈচিত্র্যে পরিচিত বাংলাদেশে ঋতুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনেক মানুষের কাছেই আগের মতো স্পষ্ট মনে হচ্ছে না। শীত দেরিতে আসা, গ্রীষ্মে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, বর্ষায় অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কিংবা শরৎ ও বসন্তের স্বল্পস্থায়িত্ব নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋতুচক্রের পরিবর্তন একটি জটিল প্রক্রিয়া। এর পেছনে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও স্থানীয় পরিবেশগত পরিবর্তন, নগরায়ন, বনভূমি হ্রাস, জলাভূমি ভরাট এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনের মতো বিষয়ও প্রভাব ফেলছে। ফলে ঋতুর আগমন, স্থায়িত্ব এবং বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তনের প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জলবায়ু বিজ্ঞানী ডক্টর মাহবুবুর রহমান বলেন, “ঋতুচক্র পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, তবে এর স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের সময় ও পরিমাণে পরিবর্তন এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ার কারণে মানুষ ঋতুর পরিচিত বৈশিষ্ট্য আগের তুলনায় কম অনুভব করছে।” তাঁর মতে, এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
আবহাওয়াবিদ ডক্টর নুসরাত জাহান বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশের অবক্ষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শহরে কংক্রিটের বিস্তার, সবুজ কমে যাওয়া এবং জলাধার ভরাটের কারণে তাপমাত্রা স্থানীয়ভাবে আরও বেড়ে যায়, যা ঋতুর অনুভূতিকে প্রভাবিত করে।”
রাজশাহীর কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, “আগে বাংলা মাস অনুযায়ী চাষাবাদের পরিকল্পনা করা সহজ ছিল। এখন কখন বৃষ্টি হবে, কখন গরম বাড়বে, তা বোঝা কঠিন হয়ে গেছে।” সিলেটের চা–শ্রমিক রওশন আরা বলেন, “বৃষ্টি অনেক সময় হঠাৎ খুব বেশি হয়, আবার দীর্ঘ সময় একেবারেই হয় না। এতে কাজের সময়সূচিও বদলে যায়।”
কৃষিবিজ্ঞানী ডক্টর ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, “ঋতুর পরিবর্তিত ধারা কৃষির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। নির্ধারিত সময়ে বৃষ্টি না হলে বীজ বপনে সমস্যা হয়, আবার অতিবৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডক্টর শারমিন আক্তার জানান, ঋতুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, “দীর্ঘ তাপপ্রবাহে হিটস্ট্রোক ও পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে, আবার অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ফলে কিছু সংক্রামক রোগের বিস্তারের পরিবেশও তৈরি হতে পারে।”
খুলনার বাসিন্দা সালমা বেগম বলেন, “আগে কখন শীতের কাপড় বের করতে হবে, সেটা প্রায় নিশ্চিত ছিল। এখন অনেক সময় শীত দেরিতে আসে, আবার হঠাৎ চলে যায়।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর হাসান বলেন, “আমাদের প্রজন্ম ঋতুর যে পরিবর্তন দেখছে, তা পরিবেশ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করে তুলছে।”
পরিবেশবিদ ডক্টর রাশেদুল করিম বলেন, “বনভূমি সংরক্ষণ, নগর সবুজায়ন, নদী ও জলাভূমি রক্ষা এবং পরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনা স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি সীমিত করা কঠিন।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ডক্টর সায়মা রহমান বলেন, “পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এখন শুধু পরিবেশগত প্রয়োজন নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, আধুনিক আবহাওয়া পূর্বাভাস, গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবর্তিত ঋতুচক্রের প্রভাব অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণেও জোর দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঋতুচক্রের পরিবর্তিত ছন্দ কোনো একক কারণের ফল নয়; বরং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও স্থানীয় পরিবেশগত পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব এতে কাজ করছে। বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, কার্যকর পরিবেশনীতি এবং সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
বদলে যাওয়া জলবায়ুতে পাল্টে যাচ্ছে ঋতুর স্বাভাবিক ছন্দ

