লবণাক্ততার বিস্তারে সংকুচিত হচ্ছে উপকূলের সুপেয় পানির ভান্ডার
মো: ইয়াছিন : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী জলোচ্ছ্বাস এবং দীর্ঘমেয়াদি লবণাক্ততার বিস্তার বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। একসময় যে পুকুর, খাল ও অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির উৎস স্থানীয় মানুষের প্রধান ভরসা ছিল, এখন সেগুলোর অনেকগুলোতেই লবণাক্ততার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ পানির এই সংকট শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, কৃষি, জীবিকা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
জলসম্পদ বিশেষজ্ঞ ডক্টর মাহবুবুর রহমান বলেন, “সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ধীরে ধীরে বাড়ার পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় লোনা পানি আরও ভেতরের দিকে প্রবেশ করছে। এর ফলে উপকূলীয় এলাকার পুকুর, খাল এবং অনেক অগভীর পানির উৎস লবণাক্ত হয়ে পড়ছে।” তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনও কিছু এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
খুলনার কয়রা উপজেলার বাসিন্দা রওশন আরা বলেন, “আগে বাড়ির পাশের পুকুরের পানি রান্না ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করতাম। এখন সেই পানি লবণাক্ত হয়ে গেছে। দূর থেকে পানি এনে সংসার চালাতে হয়।” সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, “মিষ্টি পানির অভাবে শুধু মানুষ নয়, গবাদিপশুও সমস্যায় পড়ছে। চাষাবাদ করাও আগের চেয়ে কঠিন হয়ে গেছে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডক্টর নাজমা সুলতানা জানান, দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে কিছু মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, চর্মরোগ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়তে পারে। তিনি বলেন, “নিরাপদ পানির অভাব ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখাকেও কঠিন করে তোলে। এর ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে।”
পরিবেশ গবেষক ডক্টর সায়মা করিম বলেন, “উপকূলীয় অঞ্চলের জলাধার, জলাভূমি এবং প্রাকৃতিক মিঠাপানির উৎসগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চাপের মুখে রয়েছে। এসব উৎস সংরক্ষণ না করা গেলে ভবিষ্যতে নিরাপদ পানির সংকট আরও গভীর হতে পারে।”
স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায়ও এর প্রভাব স্পষ্ট। বাগেরহাটের গৃহিণী সালমা বেগম বলেন, “এক কলস মিষ্টি পানি সংগ্রহ করতে অনেক সময় লাগে। পরিবারের সবাইকে খুব হিসাব করে পানি ব্যবহার করতে হয়।” পটুয়াখালীর কলেজশিক্ষার্থী তানভীর হাসান বলেন, “পানির সংকট এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা। ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরও বাড়তে পারে বলে সবাই চিন্তিত।”
কৃষিবিজ্ঞানী ডক্টর ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, মিষ্টি পানির অভাব কৃষি উৎপাদনের ওপরও প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, “ধান, সবজি এবং অন্যান্য ফসলের জন্য পর্যাপ্ত মিঠা পানি প্রয়োজন। লবণাক্ততা বাড়লে উৎপাদন কমে যায় এবং অনেক জমি অনাবাদি হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট মোকাবিলায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর পুনঃখনন, নিরাপদ পানির আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা, উপকূলীয় জলাধার সংরক্ষণ এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করারও প্রয়োজন রয়েছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ডক্টর রাশেদুল করিম বলেন, “উপকূলে সুপেয় পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। জলবায়ু অভিযোজন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে নেওয়া উদ্যোগই এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর হতে পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, উপকূলের সুপেয় পানির উৎসে লবণাক্ততার বিস্তার দেশের পানি নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না গেলে জনস্বাস্থ্য, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় অর্থনীতি-সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব আরও তীব্র হবে। তাই নিরাপদ পানির উৎস সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
লবণাক্ততার বিস্তারে সংকুচিত হচ্ছে উপকূলের সুপেয় পানির ভান্ডার

