এআইয়ের যুগে কর্মসংস্থানের নতুন সমীকরণ
মো ওমর সানিঃ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার বিশ্ব অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার এবং ব্যবসার ধরন বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায়। ১২ অক্টোবর ব্যাংককে শুরু হয়ে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এ বৈঠক।
বিশ্বব্যাংকের এবারের কর্মসূচির প্রথম দিনেই ‘Small AI, Big Jobs’ নামে একটি বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তুলনামূলক ছোট পরিসরের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি কীভাবে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, সে বিষয়টি আলোচনায় আসবে। আয়োজনে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নম অংশ নেবেন।
আইএমএফের ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকারী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এআই উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। একই সঙ্গে এর সঙ্গে শ্রমিক, ব্যবসা ও দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ এবং ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
এআই নিয়ে আলোচনার একটি বড় প্রশ্ন হলো উৎপাদনশীলতা। একই সময় ও সম্পদ ব্যবহার করে আরও বেশি পণ্য ও সেবা উৎপাদন করা গেলে অর্থনীতির সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়তে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার, গ্রাহকসেবা, উৎপাদন, কৃষি, স্বাস্থ্য ও সরকারি সেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের গতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে।
তবে প্রযুক্তির সুবিধা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অবকাঠামো সব দেশে সমান নয়। উন্নত অর্থনীতির অনেক প্রতিষ্ঠান দ্রুত নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারলেও উন্নয়নশীল দেশের ছোট ব্যবসা বা শ্রমিকদের জন্য প্রযুক্তির ব্যয়, দক্ষতার ঘাটতি এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হতে পারে।
এই কারণে ব্যাংককের আলোচনায় ‘ছোট এআই’ বা সহজলভ্য এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। বড় প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরির পরিবর্তে তুলনামূলক কম ব্যয়ে ব্যবসা, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সরকারি সেবায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানো গেলে উন্নয়নশীল দেশগুলোও এর কিছু সুবিধা গ্রহণ করতে পারে।
কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি অবশ্য আরও জটিল। নতুন প্রযুক্তি কিছু কাজকে সহজ বা স্বয়ংক্রিয় করতে পারে, আবার একই সঙ্গে নতুন ধরনের কাজ ও দক্ষতার চাহিদা তৈরি করতে পারে। ফলে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় কর্মসংস্থান নিয়ে পৃথকভাবে ‘Mobilizing Private Capital for Jobs’ আয়োজনও রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিনিয়োগ ও বেসরকারি মূলধনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হবে। এআইয়ের প্রসারের সঙ্গে এই আলোচনার সম্পর্কও রয়েছে, কারণ নতুন প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন।
আইএমএফের জুলাই ২০২৬-এর বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসেও প্রযুক্তির প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলেছে, এআই-চালিত চাহিদা বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কিছু অর্থনীতিকে বাড়তি গতি দিচ্ছে। একই সময়ে যুদ্ধের অভিঘাত জ্বালানি আমদানিকারক ও ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এআইয়ের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ দুই দিকই গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ জনগোষ্ঠী, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ এবং সেবা খাতের সম্প্রসারণের কারণে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে এআইনির্ভর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা করতে হলে দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল অবকাঠামো, গবেষণা এবং প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশেষ করে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। প্রচলিত কিছু দক্ষতার চাহিদা কমে গেলে নতুন প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মানুষের সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, যোগাযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো দক্ষতার গুরুত্বও বজায় থাকবে।
এআইয়ের ব্যবহার সরকারি সেবাতেও পরিবর্তন আনতে পারে। তথ্য বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি পরামর্শ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব। তবে এসব ক্ষেত্রে তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, নির্ভুলতা এবং জবাবদিহির বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের এবারের পাবলিক প্রোগ্রামে এআই ও উন্নয়ন নিয়ে আরও আলোচনা থাকবে। বিশ্বব্যাংক লাইভের কর্মসূচিতে এআইয়ের মাধ্যমে সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সক্ষমতা তৈরির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
১৬ অক্টোবর Annual Meetings Plenary এবং ১৭ অক্টোবর IMFC Plenary অনুষ্ঠিত হবে। এসব বৈঠকের পাশাপাশি বিভিন্ন সেমিনার ও আলোচনায় বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হবে।
ফলে এবারের ব্যাংকক বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল প্রযুক্তি খাতের বিষয় হিসেবে থাকবে না; এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় নীতিগত প্রশ্ন হিসেবে আলোচিত হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে নতুন প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করবে, শ্রমশক্তিকে কীভাবে প্রস্তুত করবে এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্য কমাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই হতে পারে ব্যাংককের এআই আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এআইয়ের যুগে কর্মসংস্থানের নতুন সমীকরণ

