(বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে)

পবিত্র কর্তব্য

প্রকাশঃ Sep 26, 2026 - 19:06
পবিত্র কর্তব্য

রচনা: শহীদ শাহাজী
যাত্রাদলের লাইন ম্যানেজার হিসেবে দলের সংগঠকের দায়িত্ব পাওয়ার পর শুরু হলো এক নতুন পথচলা। দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরে ঘুরে শিল্পী ও কলাকুশলী সংগ্রহ করতে থাকলাম। সেই সময় আমাদের দলে একজন সাইড নায়িকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অনেক খোঁজ করেও উপযুক্ত কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না।
একদিন মধুমতি অপেরার পঙ্কজদা আমাকে একটি ঠিকানা দিলেন। বললেন, সেখানে গেলে হয়তো একজন উপযুক্ত শিল্পী পাওয়া যেতে পারে।
ঠিকানা অনুযায়ী বরিশালের বাটাজোরের উদ্দেশে রওনা হলাম। বর্ষার সন্ধ্যা। নৌকায় করে পৌঁছালাম এক অজপাড়া গাঁয়ে। ছোট্ট একটি বাজার। চারদিকে অন্ধকার, কেবল কেরোসিনের বাতির ক্ষীণ আলোয় বাজারের কিছু দোকান আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে।
একটি ছোট দোকানের সামনে এসে থামলাম। দোকানটি আসলে গ্রামের এক ডাক্তারের চেম্বার। মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকলাম। কথাবার্তায় বুঝতে পারলাম, যার সন্ধানে আমি এসেছি, সে সদ্য এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা এবং বাবার অসুস্থতার কারণে তার আর লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। জীবন-জীবিকার তাগিদে সে তখন যাত্রাদলে উঠতি সাইড নায়িকা হিসেবে কাজ শুরু করেছে।
দোকানদার ডাক্তার হাতে হারিকেন নিয়ে সামনে হাঁটতে লাগলেন, আমি পেছনে। বর্ষার পিচ্ছিল পথ পেরিয়ে বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর একটি পুরোনো বাড়ির সামনে এসে তিনি থামলেন।
—“এই তাদের বাড়ি।”
বাড়িতে ছিলেন তার মা, ভাই এবং ক্যানসারে আক্রান্ত বাবা।
মেয়েটিকে দেখে আমার পছন্দ হলো। কথাবার্তার একপর্যায়ে সে এক কথায় আমাদের দলে কাজ করার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। তবে শর্ত ছিল—তৎক্ষণাৎ সাত হাজার টাকা অগ্রিম দিতে হবে।
আমি টাকা দিয়ে দিলাম। কারণ সাইড নায়িকার জন্য আমাদের বাজেট আরও বেশি ছিল। সেদিন রাতে তাদের বাড়িতেই খাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা হলো।
পরদিন সকালে হৃদয়বিদারক একটি দৃশ্য দেখলাম।
মেয়েটি তার বাবার হাতে সেই টাকা তুলে দিয়ে প্রণাম করল। বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—
“ভাইকে বলো, আমাদের দলের রিহার্সেল বাড়ি আরিচা ঘাটে। বাবাকে ঢাকায় ডাক্তার দেখিয়ে আরিচা ঘাটের ওপর দিয়ে এসো।”
এরপর সে ঠাকুরঘর থেকে প্রসাদ এনে বাবার হাতে দিল।
মেয়েটির বাবা হয়তো তখন সবকিছু বুঝে গিয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন—তার ছোট্ট মেয়েটি নিজের স্বপ্ন, নিজের ভবিষ্যৎ, এমনকি নিজের জীবনটাকেও যেন বিসর্জন দিয়ে বাবার চিকিৎসার টাকা সংগ্রহ করেছে।
সেদিন বাবা ও মেয়ের চোখে আমি যে অশ্রু দেখেছিলাম, সেই দৃশ্য আজও আমার চোখে ভাসে।
কিছুক্ষণ পর মেয়েটি আমার সঙ্গে নৌকায় উঠে বসল। নদীর পাড়ে তখন ছোট ছোট অনেক শিশু আর পল্লিবধূ দাঁড়িয়ে। সবাই যেন নীরবে তাকে বিদায় জানাচ্ছিল।
তিন দিন পর আরিচা ঘাটের রিহার্সেল বাড়িতে ব্যস্ততা তুঙ্গে। রাত প্রায় দশটা। হঠাৎ একটি পিকআপ এসে রিহার্সেল বাড়ির গেটে থামল। গাড়ি থেকে মেয়েটির ভাই নেমে এল।
তাকে দেখেই আমার বুকটা কেঁপে উঠল।
আমি বুঝে গেলাম—কোনো অঘটন ঘটেছে। কারণ তার বাবা তখন ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন।
আমি দ্রুত ছুটে গিয়ে তার ভাইকে সতর্ক করলাম।
বললাম,
“রিহার্সেল চলছে। এই সময়ে কোনো দুঃসংবাদ দেওয়া ঠিক হবে না। তুমি একটু বসো, আমি দেখছি।”
এদিকে সাইড নায়িকা রিহার্সেলের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। আমি তার কাছে গিয়ে বললাম—
“আজ তোমার রিহার্সেলে যাওয়া লাগবে না।”
সে বিস্মিত হয়ে বলল—
“যাব না?”
আমি কোনো কথা না বলে ইশারায় গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লাল কাপড় বাঁধা পিকআপটির দিকে দেখিয়ে বললাম—
“যাবে… তবে বাড়িতে।”
কথাটি বুঝতে তার এক মুহূর্তও লাগল না।
সে এক ঝটকায় আমাকে দরজা থেকে সরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠল—
“বাবা!”
দৌড়ে গিয়ে পিকআপটির কাছে পৌঁছেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
পিকআপে তখন তার বাবার নিথর দেহ।
দলের সবাই মিলে তাকে এবং তার ভাইকে সেই লাশবাহী পিকআপে তুলে দিলাম। মেয়েটি ফিরে গেল বাবার শেষকৃত্যে অংশ নিতে।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ হয়নি।
বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করে সে আবার আমাদের দলে ফিরে এল। চুক্তি অনুযায়ী পুরো এক মৌসুম অভিনয় করল।
যে মেয়েটি বাবার চিকিৎসার জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছিল, বাবার প্রতি সেই পবিত্র দায়িত্ব পালন করার পর তার জীবনে যেন সাফল্যের দরজা খুলে গেল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সে যাত্রাঙ্গনে পরিচিতি ও খ্যাতির শিখরে উঠে গেল।
আজ জানি না, সে কোথায় আছে। কেমন আছে। বহু বছর আগে শুনেছিলাম, আমার এক পরিচিত মিউজিক মাস্টারের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে।
জীবনের পথে মানুষ হারিয়ে যায়, সময় বদলে যায়, সম্পর্কের ঠিকানাও বদলে যায়। কিন্তু কিছু মানুষকে কখনো ভোলা যায় না।
সেই মেয়েটিও আমার স্মৃতিতে আজও তেমনই একজন।
বাবার প্রতি একজন মেয়ের যে দায়িত্ব, যে ভালোবাসা, যে আত্মত্যাগ—সেদিন আমি তার এক জীবন্ত উদাহরণ দেখেছিলাম। নিজের ভবিষ্যৎকে বিসর্জন দিয়ে বাবার চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহ করা, বাবার হাতে সেই অর্থ তুলে দেওয়া এবং শেষ মুহূর্তে বাবার নিথর দেহের পাশে ছুটে যাওয়া—এ যেন সন্তানের ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
যেখানেই থাকুক, সে যেন সুখে থাকে—এই প্রার্থনাই করি।
বাবার প্রতি একজন মেয়ের সেই পবিত্র কর্তব্য পালনের সাক্ষী হয়ে থাকার কারণে আজও তার জন্য আমার অন্তর থেকে মঙ্গলকামনা বেরিয়ে আসে।
ভালো থেকো, অচেনা সেই মেয়েটি।
তোমার বাবার প্রতি তোমার সেই পবিত্র কর্তব্যের কথা হয়তো তুমি ভুলে গেছো, কিন্তু আমি কোনোদিন ভুলব না।

পবিত্র কর্তব্য
লোগো
Sep 26, 2026

পবিত্র কর্তব্য

লোগো
বিস্তারিত কমেন্টে
shadhindiganta.com
/ Shadhin Diganta