অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে নতুন গতি আনতে চায় বাংলাদেশ-ভারত
ভৌগোলিক নৈকট্যকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ দিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা, স্বাভাবিক বাণিজ্য পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সচিবালয়ে কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক, বিদ্যমান সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সিআইআইয়ের ডিরেক্টর জেনারেল চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আয়তন, জনসংখ্যা ও অর্থনীতির আকারে পার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশ ও ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান পারস্পরিক সহযোগিতার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অবস্থান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনীতির আকার বড় হলেও আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য তুলনামূলক কম উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো গেলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের বিষয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আলোচনা প্রয়োজন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বৈঠকে ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের ভিসা জটিলতার বিষয়টিও উঠে আসে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসা, ব্যবসা ও অন্যান্য প্রয়োজনে নিয়মিত যাতায়াতকারীদের জন্য কয়েক মাস পরপর নতুন ভিসার আবেদন করা বাস্তবসম্মত নয়। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ভিসা ব্যবস্থার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন।
এদিকে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে দুটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে সিআইআই। এর একটি অবকাঠামো খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) বাড়াতে এবং অন্যটি সেমিকন্ডাক্টর, গ্রিন হাইড্রোজেন, ব্যাটারি স্টোরেজ ও ডাটা সেন্টারের মতো ভবিষ্যৎমুখী শিল্পে সহযোগিতা জোরদারে কাজ করবে।
সিআইআই প্রতিনিধিরা জানান, ভারতে গত বছর অবকাঠামো খাতে প্রায় ২৫ লাখ কোটি রুপি বিনিয়োগ হয়েছে, যার বড় একটি অংশ এসেছে বেসরকারি খাত থেকে। ভারতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশেও দেশি-বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ রয়েছে বলে তারা মত দেন।
বৈঠকে স্থানীয় উৎপাদনশীল শিল্পের সক্ষমতা কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিও বাড়বে।
এনার্জিপ্যাকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের উদাহরণ তুলে এক প্রতিনিধি বলেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগ থাকলেও অনেক পণ্য আমদানি করতে হয়। স্থলবন্দর দিয়ে এসব পণ্য আনতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। স্থানীয় শিল্প পুনরুজ্জীবিত হলে এ ধরনের সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এফএমসিজি খাতেও বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে সিআইআই। ঢাকার আশপাশে সাবান, হোম কেয়ার ইনসেক্টিসাইড ও ফ্র্যাগরেন্সসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে একটি আধুনিক সমন্বিত কারখানা স্থাপনের আগ্রহের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে অনিবন্ধিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
শিল্পে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে শুল্ক কাঠামো সমন্বয়ের আহ্বান জানানো হয়। সিআইআই প্রতিনিধিরা জানান, তাদের স্টিম-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করলে টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক ও খাদ্যশিল্পে ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। তবে শুল্ক বৈষম্যের কারণে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের তরুণদের ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের সুযোগ এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের তৃতীয় দেশে কাজের ক্ষেত্রে ভিসা জটিলতা নিরসনে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে সিআইআই।
বৈঠকে উভয় পক্ষই আনুষ্ঠানিক আলোচনার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ, ব্যবসায়ী পর্যায়ের সম্পৃক্ততা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার ওপর গুরুত্ব দেয়।
-স্বাধীন/ এমএ
অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে নতুন গতি আনতে চায় বাংলাদেশ-ভারত

