বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারে আগ্রহী ফ্রান্স: রাষ্ট্রদূত
বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর ও জোরদার করতে চায় ফ্রান্স। অর্থনীতি, জলবায়ু, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত জিন-মার্ক সেরে-চারলেট।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত ‘ডিক্যাব টক’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে আমন্ত্রণের জন্য ডিক্যাবের নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানান ফরাসি রাষ্ট্রদূত। একই সঙ্গে ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটির দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা কার্যক্রমের প্রশংসা করেন তিনি।
বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিকে আগের তুলনায় আরও ‘বিশৃঙ্খল, বিপজ্জনক ও অনিশ্চিত’ হিসেবে উল্লেখ করে জিন-মার্ক সেরে-চারলেট বলেন, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত অনেক ক্ষেত্রেই যোগাযোগের একটি সাধারণ পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রও সংকুচিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্ব বর্তমানে একটি গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বলপ্রয়োগের প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এ অবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৫০ সালে তৎকালীন ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট শুম্যান যে ধারণা দিয়েছিলেন, তা পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় একীকরণের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, ইউরোপীয় প্রকল্পে ধীরগতি রয়েছে এবং সংস্কারের প্রয়োজন আছে—এমন মত দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁও। তবে ইউরোপীয় একীকরণের মূল লক্ষ্য সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেন।
সৌদি আরবের সঙ্গে সহসভাপতিত্বে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান নিয়ে আয়োজিত একটি যৌথ সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে ফ্রান্স এ সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও বেলজিয়ামসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশের অনুরূপ উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত।
তিনি বলেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্যতম লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিপ্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করা, ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি ফ্রান্সের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা।
বাংলাদেশকে ফ্রান্সের ‘দীর্ঘদিনের, নির্ভরযোগ্য ও অনুমানযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা, বহুপক্ষীয়তা ও শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে মূল্যবোধের মিল রয়েছে।
তিনি বলেন, ফ্রান্স একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে সব ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং আরব ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ফ্রান্সের অবস্থান তুলে ধরে জিন-মার্ক সেরে-চারলেট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ফ্রান্স বহুপাক্ষিক ‘তৃতীয় পথ’ বা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অংশীদার দেশগুলোকে নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে সহায়তা করা ফরাসি নীতির অন্যতম লক্ষ্য বলেও জানান তিনি। এতে কোনো দেশকে ওয়াশিংটন বা বেইজিংয়ের মধ্যে একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপের মুখে পড়তে হবে না বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রদূত।
ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। অবৈধ মাছ ধরা, জলদস্যুতা ও পাচারের মতো অপ্রথাগত নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা জানান তিনি।
বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গতিশীল হলেও বাণিজ্যে কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সাড়ে চার বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়েছে। তবে ফরাসি রপ্তানির তুলনায় বাংলাদেশ থেকে আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফ্রান্সের বাংলাদেশ থেকে মোট আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশই টেক্সটাইল খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও পরিধেয় পণ্য থেকে আসে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া বিমান চলাচল, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতেও দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। পরিবহন, জ্বালানি ও টেকসই নগর উন্নয়নেও ফরাসি শিল্পগোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম রয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত।
ভবিষ্যতে ফার্মাসিউটিক্যালস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মতো খাতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জলবায়ু কূটনীতিতে ফ্রান্সের ভূমিকা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে ফ্রান্স পরিবেশগত সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের সঙ্গে অভিযোজন, টেকসই অবকাঠামো এবং দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা আরও বাড়ানোর কথাও জানান তিনি।
ফরাসি উন্নয়ন সংস্থার তহবিলের ৮০ শতাংশের বেশি জলবায়ু সহনশীলতা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত। বাংলাদেশে টেকসই অবকাঠামো ও সবুজ অভিযোজনমূলক উদ্যোগে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তরণ এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়াতেও ফ্রান্স সহযোগিতা করছে বলে জানান জিন-মার্ক সেরে-চারলেট।
নারীর অধিকার ও জেন্ডার সমতার ক্ষেত্রেও ফ্রান্সের ‘নারীবাদী পররাষ্ট্রনীতি’র কথা তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২০৩০ মেয়াদের কৌশলে শিক্ষা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও প্রজনন অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি নারীবাদী জলবায়ু পদক্ষেপ, ডিজিটাল অধিকার এবং সমতাভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিকেও নতুন অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ফ্রান্স-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভিন্ন মূল্যবোধ ও শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের পক্ষে থাকা দেশগুলোর আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ফ্রান্স বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও জোরদার করতে প্রস্তুত। দুই দেশের সম্পর্ক শুধু ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনীতি ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
বক্তব্যের শেষ দিকে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘ফ্রান্স-বাংলাদেশ সম্পর্কের দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে।’
-স্বাধীন/এমএ
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারে আগ্রহী ফ্রান্স: রাষ্ট্রদূত

