গ্রেফতার-রিমান্ডের পরও গাজী নজরুলের এমপি পদ বহাল, প্রশ্ন টিআইবির
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা নানা গুরুতর অভিযোগ, দলীয় তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হয়ে বহিষ্কার এবং মরিয়ম খাতুনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেফতার ও পুলিশ রিমান্ডে থাকার পরও তার সংসদ সদস্যপদ কীভাবে বহাল থাকে—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
একই সঙ্গে মরিয়ম খাতুনের মৃত্যু এবং এর আগে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা সেক্সটরশন বা যৌন ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগের নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের জন্য দ্রুত একটি বিশেষায়িত ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব দাবি জানায় টিআইবি।
বিবৃতিতে বলা হয়, কিশোরী মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, তাকে সংসদে চাকরি দেওয়া এবং তার বাবাকে ঠিকাদারি লাইসেন্স করে সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভনের অভিযোগ রয়েছে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। পরবর্তী সময়ে মরিয়মকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি করার বিষয়টিও সামনে আসে। দলীয় তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ার পর তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
সর্বশেষ মরিয়মের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গ্রেফতার হয়ে গাজী নজরুল ইসলাম চার দিনের পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে টিআইবি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না। তবে সংসদ ও সংসদ সদস্যদের মর্যাদাহানিকর পরিস্থিতির জন্য দায়ী ব্যক্তির সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকা গ্রহণযোগ্য কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, দলীয় তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হয়ে বহিষ্কার, পদ ও প্রভাব ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলায় গ্রেফতার ও রিমান্ডে থাকার পরও গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদ বহাল থাকাকে অন্য সংসদ সদস্যরা কীভাবে দেখছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ফৌজদারি দায় নির্ধারণের এখতিয়ার আদালতের। তবে একজন সংসদ সদস্যের নৈতিকতা, ক্ষমতার ব্যবহার এবং জনগণের আস্থার বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংসদের। তাই গাজী নজরুল ইসলামের সংসদীয় অবস্থান নিয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দ্রুত স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
টিআইবি জানায়, সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ড হলে একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হন। ফলে শুধু অভিযোগ, গ্রেফতার, রিমান্ড কিংবা দলীয় তদন্তের সিদ্ধান্তের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাজী নজরুল ইসলামের সাংবিধানিক অযোগ্যতা তৈরি হয় না।
তবে গুরুতর নৈতিক স্খলন, স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্নকারী আচরণের ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্যপদ বাতিল বা আসন শূন্য হওয়ার বিষয়টি কার্যকর হবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট বিধান প্রয়োজন বলে মনে করছে টিআইবি।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক বলেন, গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে পদ ও প্রভাবের অপব্যবহার, বিশেষ করে সেক্সটরশনসহ সব অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
টিআইবি আরও বলেছে, সংসদ সদস্যদের নৈতিক স্খলনের ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন গবেষণা ও স্থানীয় পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে এর আগেও সংসদ সদস্যদের নৈতিক স্খলনের নানা ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও আলোচিত হয়েছে। তবে এসব ঘটনায় কার্যকর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিবৃতিতে বলা হয়, সংসদ সদস্যদের জন্য আলাদা, পূর্ণাঙ্গ ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়নের দাবি টিআইবির দীর্ঘদিনের। সংস্থাটির মূল খসড়ার ভিত্তিতে ২০১০ সালে ‘দ্য মেম্বার্স অব পার্লামেন্ট কন্ডাক্ট বিল, ২০১০’ সংসদে উত্থাপিত হলে টিআইবি তা দ্রুত পাস করার পাশাপাশি সব দলের প্রতিনিধিত্বে একটি এথিকস কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছিল।
প্রস্তাবিত ওই বিলে ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রভাব খাটানো থেকে বিরত থাকা, স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলা এবং নিয়োগ, পদোন্নতি বা বদলির ক্ষেত্রে সুপারিশ না করার মতো বিভিন্ন বিধান রাখা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটি আইনে রূপ নেয়নি।
টিআইবি জানায়, ২০২৪-পরবর্তী রাষ্ট্রসংস্কারের প্রত্যাশাতেও সংসদ সদস্যদের জন্য পৃথক আচরণবিধির প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সংসদ সদস্যদের জন্য পৃথক ‘মেম্বার অব পার্লামেন্ট কন্ডাক্ট অ্যাক্ট’ প্রণয়নের সুপারিশ করেছে। একইভাবে দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশে জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ বিবরণী প্রতিবছর হালনাগাদের বিধানসহ আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংস্থাটির দাবি, এ বিষয়ে সব রাজনৈতিক দল শর্তহীন ঐকমত্য প্রকাশ করেছে। ২০২৪-পরবর্তী বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব এবং ২০২৬ সালে বর্তমান সরকারের কাছে দেওয়া সুপারিশেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জন্য কার্যকর আচরণবিধি প্রণয়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে টিআইবি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে এবং এর সমাধানের পথও জানা আছে। এরপরও তা বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না কেন—এ প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্টদের দিতে হবে।
-স্বাধীন/এমএ
গ্রেফতার-রিমান্ডের পরও গাজী নজরুলের এমপি পদ বহাল, প্রশ্ন টিআইবির

