মৃত্যুফাঁদে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক, ফোর লেনের অপেক্ষা

প্রকাশঃ Oct 1, 2026 - 15:24
মৃত্যুফাঁদে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক, ফোর লেনের অপেক্ষা

লালমনিরহাটের প্রাণ বলে খ্যাত লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক। বুড়িমারী স্থলবন্দরের কারণে ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশের পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে এই সড়ক দিয়ে। প্রতিদিন কয়েক শ ভারী পণ্যবাহী ট্রাকসহ হাজারো যানবাহনের চাপ থাকে মহাসড়কটিতে।

অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই মহাসড়কই এখন স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপ্রশস্ত সড়ক, বেহাল অবকাঠামো, অপরিকল্পিত সংস্কার এবং দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ফোর লেনের প্রতিশ্রুতির কারণে ব্যস্ত এই মহাসড়কটি যেন পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর থেকে চলতি বছরের এ পর্যন্ত মহাসড়কটিতে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় অন্তত ৪৬ জনের প্রাণ গেছে। দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করলেও এর পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান নেই।

বাড়ছে যানবাহন, বাড়ছে দুর্ঘটনা

বুড়িমারী স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক পরিধি ও যানবাহনের চাপ ক্রমেই বাড়লেও মহাসড়কটির প্রশস্ততা সেভাবে বাড়েনি। সরু সড়কে ভারী পণ্যবাহী ট্রাক, দূরপাল্লার বাস, থ্রি-হুইলার, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের একসঙ্গে চলাচলে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা।

সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ ও ইট উঠে গিয়ে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও সংস্কারের নামে সড়কের ওপর অপরিকল্পিতভাবে ইট ও খোয়া ফেলে রাখা হয়েছে। এতে যানবাহন চলাচলে ঝুঁকি বাড়ছে এবং প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।

বিশেষ করে আদিতমারী উপজেলার নামুড়ি-পলাশী ও কালীগঞ্জের ভোটমারী এলাকার কয়েকটি অংশসহ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

আদিতমারীর স্থানীয় বাসিন্দা লাভলু মিয়া বলেন, সড়কটি এমনিতেই অনেক সরু। এর ওপর বিভিন্ন স্থানে ইট-খোয়া উঠে গেছে। আবার মেরামতের নামে সড়কের ওপর ইট ফেলে রাখায় দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন এই পথে চলাচল করে। দ্রুত মহাসড়কটি ফোর লেনে উন্নীত করার দাবি জানান তিনি।

জেলায় কর্মরত সাংবাদিক খোরশেদ আলম সাগর বলেন, লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ প্রতিদিন এই মহাসড়ক ব্যবহার করেন। পাশাপাশি বুড়িমারী স্থলবন্দরের পণ্য পরিবহনেও সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে ফোর লেনের কথা বলা হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ

লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, অপ্রশস্ত সড়কের তুলনায় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপই দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। এর সঙ্গে চালকদের বেপরোয়া গতি, পণ্যবাহী যানবাহনের অতিরিক্ত ওজন এবং মহাসড়কে ধীরগতির থ্রি-হুইলার ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোর কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

ফোর লেনের জন্য চলছে প্রাথমিক কাজ

লালমনিরহাট সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক বলেন, মহাসড়কের খানাখন্দ নিয়মিত মেরামতের মাধ্যমে যান চলাচলের উপযোগী রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। বুড়িমারী ও মিশন মোড় থেকে সাপটিবাড়ীসহ বাজারসংলগ্ন ব্যস্ত এলাকাগুলোতে সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলছে।

তিনি বলেন, স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে পুরো মহাসড়কটি ফোর লেনে উন্নীত করার জন্য ১১০ ফুট জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক জরিপ শেষ হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন নকশার কাজ চলছে। এরপর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

ভূমি অধিগ্রহণ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করে মূল প্রকল্পের কাজ মাঠপর্যায়ে শুরু হতে আরও অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।

প্রতিদিন বাড়ছে বন্দরকেন্দ্রিক চাপ

লালমনিরহাট জেলা ট্রাক ও ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, লালমনিরহাট থেকে বুড়িমারী পর্যন্ত মহাসড়কটি অনেকটাই সরু। ট্রাক ওভারটেক করার সময় প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হয় এবং কোথাও কোথাও বড় দুর্ঘটনাও ঘটে।

তাঁর দাবি, বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালিত হওয়ায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ট্রাক এই সড়ক ব্যবহার করে। কিন্তু সড়কের সংকীর্ণতা ও বেহাল অবস্থার কারণে পণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। দ্রুত মহাসড়কটি ফোর লেনে উন্নীত করার দাবি জানান তিনি।

বুড়িমারী স্থলবন্দরের ট্রাফিক শাখার সহকারী পরিচালক মাহমুদুর হাসান বলেন, মহাসড়কটি তুলনামূলক সরু হওয়ায় প্রায়ই যানজট তৈরি হয়। এতে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় লাগে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি জানান, প্রতিদিন ভুটান থেকে প্রায় ২০০টি এবং ভারত থেকে প্রায় ১৫০টি ট্রাক বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসে। যানজটের কারণে অনেক সময় একদিনে এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয় না।

সড়কটি প্রশস্ত করে ফোর লেনে উন্নীত করা হলে পরিবহন সময় ও ব্যয় কমবে এবং এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে বলে মনে করেন তিনি।

‘দ্রুত ফোর লেনে রূপান্তরের কাজ শুরু হবে’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, আগের সরকারের সময়ে এই মহাসড়ক নিয়ে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে কাজের অগ্রগতি হয়নি। বর্তমানে সড়কটির অ্যালাইনমেন্ট সংশোধনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সড়কটি সোজা করে ফোর লেনে উন্নীত করতে বড় পরিমাণ জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের ক্ষতি কমাতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ জমিই অধিগ্রহণ করে দ্রুত মহাসড়কটি ফোর লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু করা হবে।

নিরাপদ মহাসড়কের অপেক্ষায় স্থানীয়রা

স্থানীয়দের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই পথটি দীর্ঘদিন ধরে অপ্রশস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বাড়তে থাকা যানবাহনের চাপ সামাল দিতে দ্রুত মহাসড়কটি ফোর লেনে উন্নীত করা জরুরি।

একই সঙ্গে চলমান সংস্কারকাজে পরিকল্পনা ও মান নিশ্চিত করে দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের প্রত্যাশা, নিরাপদ ও প্রশস্ত সড়ক হলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমার পাশাপাশি বুড়িমারী স্থলবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি ফিরবে।

-স্বাধীন/এস

মৃত্যুফাঁদে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক, ফোর লেনের অপেক্ষা
লোগো
Oct 1, 2026

মৃত্যুফাঁদে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক, ফোর লেনের অপেক্ষা

লোগো
বিস্তারিত কমেন্টে
shadhindiganta.com
/ Shadhin Diganta