ব্রহ্মপুত্রের বুকে নৌকাবাইচ, উৎসবে হাজারো মানুষ
ব্রহ্মপুত্রের বুকে পাশাপাশি ছুটছিল একের পর এক নৌকা। মাঝিদের দ্রুত বৈঠা টানার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল গতি। নদীর দুই পাড় থেকে ভেসে আসছিল করতালি আর হর্ষধ্বনি। কেউ মুঠোফোনে ধারণ করছিলেন নৌকার দৌড়, কেউ আবার পছন্দের নৌকাকে উৎসাহ দিতে চিৎকার করছিলেন।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেলে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার দক্ষিণ চরটেকী এলাকায় এমনই উৎসবের আবহ তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচকে ঘিরে।
উপজেলার দক্ষিণ চরটেকী মিনি কক্সবাজার এলাকার ব্রহ্মপুত্র নদে দক্ষিণ চরটেকী গ্রামবাসীর উদ্যোগে এ নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়।
দীর্ঘদিন পর নৌকাবাইচ দেখতে নদীর দুই পাড়ে ভিড় করেন হাজারো নারী-পুরুষ, শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠ। নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে দূর-দূরান্ত থেকে স্বজনেরাও ছুটে আসেন আত্মীয়ের বাড়িতে। পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজন উপভোগ করেন তারা।
প্রতিযোগিতায় আট নৌকা
আয়োজকরা জানান, এবারের নৌকাবাইচে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট আটটি নৌকা অংশ নেয়। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর প্রথম স্থান অর্জন করে কটিয়াদী উপজেলার করগাঁওয়ের দুলাল চেয়ারম্যানের নৌকা।
দ্বিতীয় হয় একই এলাকার হাবিবুর রহমান জালাল মিয়ার নৌকা। আর তৃতীয় স্থান অর্জন করে পাকুন্দিয়ার বাহাদিয়া এলাকার ইসমাইলের নৌকা।
প্রথম স্থান অর্জনকারী দলকে একটি মোটরসাইকেল, দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে একটি রেফ্রিজারেটর এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে একটি এলইডি টেলিভিশন পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অন্য দলগুলোকেও দেওয়া হয় সান্ত্বনা পুরস্কার।
ছিলেন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা
নৌকাবাইচের প্রধান অতিথি ছিলেন কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন।
এর আগে নৌকাবাইচের উদ্বোধন করেন পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস।
উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ভিপি মো. কামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম আরিফুর রহমান, উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক তৌফিকুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক আতিকুর রহমান মাসুদ ও পৌর বিএনপির সভাপতি এসএএম মিনহাজ উদ্দিন।
দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাস
নৌকাবাইচ দেখতে মঙ্গলবাড়িয়া এলাকা থেকে এসেছিলেন নওশাদ আলম বাপ্পী। তিনি বলেন, “এখানে আমার ফুফুর বাড়ি। আমি এখানেই বড় হয়েছি। নৌকাবাইচ অনেক উপভোগ করেছি। এবার সন্তানকে নিয়ে আবারও দেখতে এসেছি। খুব ভালো লাগছে।”
পাশের গফরগাঁও উপজেলার দত্তের বাজার এলাকা থেকে আসা সবেদ আলী বলেন, “এখানে নৌকাবাইচ দেখতে এসেছি। অনেক মানুষের ভিড়। অনেক দিন পর নৌকাবাইচ উপভোগ করতে পেরে খুবই আনন্দিত।”
বাহাদিয়া এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ নিজাম উদ্দিন বলেন, “একসময় প্রচুর নৌকাবাইচ হতো। এখন অনেকটাই কমে গেছে। লোকমুখে শুনে এখানে নৌকাবাইচ দেখতে এসেছি।”
আয়োজক কমিটির পক্ষে কুতুব উদ্দিন কিরণ বলেন, “নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য। গ্রামের মানুষকে বিনোদনের সুযোগ করে দেওয়াই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। হাজারো মানুষ নদীর পাড়ে এসে নৌকাবাইচ উপভোগ করেছেন। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এ আয়োজন করার ইচ্ছা রয়েছে।”
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও ব্রহ্মপুত্রের দুই পাড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। নৌকার ছুটে চলা, বৈঠার ছন্দ আর দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাসে ফিরে আসে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচের সেই চেনা আবহ।
-স্বাধীন/এস
ব্রহ্মপুত্রের বুকে নৌকাবাইচ, উৎসবে হাজারো মানুষ

