বারবার তাগাদার পরও শিশুদের হামের টিকা দেয়নি বিগত সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে আগের সরকার সরাসরি কেনাকাটার পরিবর্তে ওপেন টেন্ডার পদ্ধতিতে যেতে চেয়েছিল। বিদেশি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে একাধিকবার অনুরোধ জানানো হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। এতে টিকা সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।
এর ফলে চার বছরের যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, দায়িত্ব নেওয়ার পর তার প্রভাব বর্তমান সরকারকে সামলাতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দেশব্যাপী বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় সরকারকে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। ২০২০ সালের ২০ ডিসেম্বরের পর প্রতি চার বছর অন্তর ব্যাপক পরিসরে মহামারি প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার দায়িত্ব ছিল সরকারের।
তবে ২০২০ সালের পর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এ ধরনের টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ ছিল বলে জানান তিনি।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, টিকা সংগ্রহে ইউনিসেফের ডেলিগেটেড পদ্ধতিতে সরাসরি কেনার সুযোগ থাকলেও আগের সরকার ওপেন টেন্ডারে যেতে চেয়েছিল। বিদেশি সংস্থাগুলো বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার অনুরোধ করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে টিকা সংগ্রহে সময়ক্ষেপণ হয় এবং চার বছরের একটি ঘাটতি তৈরি হয়।
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতির কারণে দেশের অনেক মাকে কষ্ট পেতে হয়েছে এবং অনেক মায়ের বুক খালি হয়েছে। ১ কোটি ৮৫ লাখ ৮৩৩ জনের মধ্যে প্রায় এক হাজার শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
একটি শিশুর মৃত্যুও অত্যন্ত দুঃখজনক উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, একটি মায়ের সন্তান হারানোর কষ্ট অত্যন্ত গভীর।
তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর ৫ এপ্রিল থেকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়। প্রথম ধাপে ইউনিসেফ নির্ধারিত তিনটি পর্যায়ে ১৮টি জেলায় কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
পরবর্তী সময়ে ঢাকা ও আরও দুটি বড় সিটি করপোরেশনকে কর্মসূচির আওতায় আনা হয়। ৪ মে থেকে কর্মসূচি শুরুর কথা থাকলেও তা এগিয়ে এনে ২০ এপ্রিল থেকেই সারা দেশে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হয়। এ কর্মসূচিতে ১ কোটি ৮৫ লাখ ৮৩৩ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির সমস্যাও দেখা গেছে। চিকিৎসকদের মতে, হাম আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ নিউমোনিয়া এবং এর সঙ্গে থাকা অপুষ্টি। শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টি না থাকায় অনেক শিশু হাম আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। গুরুতর অবস্থায় তাদের ফুসফুসে অক্সিজেন প্রবেশেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে আইসিডিডিআরবির চিকিৎসক চিশতি মাত্র ১৫০ টাকা খরচে বোতলভিত্তিক সিপ্যাপ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। স্বাভাবিকভাবে অক্সিজেন নিতে না পারা শিশুদের এই পদ্ধতিতে অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অনেক শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ভিটামিন এ ক্যাপসুল কর্মসূচিতে ২ কোটি ২৫ লাখ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে টিকা পেয়েছিল ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশু। দুই কর্মসূচির মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ শিশুর ব্যবধানের কারণ খুঁজে বের করতে নতুন করে শিশুদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে আগের ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পরের দিন থেকে ঈদুল আজহার পরের দিন পর্যন্ত আরও প্রায় ১৪ লাখ শিশুকে খুঁজে বের করে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে এরপরও হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় নতুন করে টিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইউনিসেফ ১০ দিনের মধ্যে আরও ৪০ লাখ ডোজ টিকা সরবরাহ করেছে। আগের মজুদের সঙ্গে নতুন টিকা যুক্ত করে এবার ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে ক্যাচআপ কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ লাখ নতুন জন্ম নেওয়া শিশু এবং বাকি ২৪ লাখ আগে বাদ পড়া শিশু।
তিনি বলেন, শনিবার থেকে সারা দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ক্যাম্প এবং প্রতিটি উপজেলায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, সিভিল সার্জন, ইউএনও ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে আগের চেয়েও জোরদারভাবে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। কর্মসূচি সফল করতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অনেক মা কর্মজীবী হওয়ায় দিনের বেলায় সন্তানকে নিয়ে টিকাদান কেন্দ্রে আসতে পারেন না। তাদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বন্ধের দিনেও টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সন্ধ্যার পরও টিকাদান কার্যক্রম চলবে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে এই ক্যাম্পেইনের আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরও প্রায় ১০ লাখ ডোজ টিকা মজুদ থাকবে। ইতোমধ্যে ৪৩ লাখ ডোজ টিকা বিভিন্ন উপজেলায় বিতরণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মপআপ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার জন্যও প্রয়োজনীয় টিকা সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
-স্বাধীন/এমএ
বারবার তাগাদার পরও শিশুদের হামের টিকা দেয়নি বিগত সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

