মেসি-রোনালদোর শেষ অধ্যায়: বিদায়ের পথে দুজন, পথ আলাদা
বয়স চল্লিশ পেরিয়েও নিজের ফিটনেস নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে পর্তুগিজ এই তারকা জানিয়েছেন, গত বিশ্বকাপের পর জাতীয় দল থেকে অবসরের কথা ভেবেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। জাতীয় দলের জার্সিতে এখনও খেলে যাচ্ছেন রোনালদো।
অন্যদিকে তার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি এগোচ্ছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। আর্জেন্টিনার হয়ে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। বুয়েনস আয়ার্সে তাকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে বিদায় সংবর্ধনার আবহ, যেখানে হাজারো সমর্থক প্রিয় অধিনায়ককে শেষবারের মতো জাতীয় দলের জার্সিতে দেখার অপেক্ষায়।
প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষস্থান ভাগাভাগি করেছেন মেসি ও রোনালদো। ২০০৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ১৫টি ব্যালন ডি’অরের ১৩টিই জিতেছেন এই দুই তারকা। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু পরিসংখ্যান ও ট্রফির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা পরিণত হয়েছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়ে।
এখন ৪১ বছর বয়সী রোনালদো এবং ৩৯ বছর বয়সী মেসি দাঁড়িয়ে আছেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ভিন্ন দুই সমাপ্তির সামনে। মেসি যেখানে অর্জনের পূর্ণতা নিয়ে বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, রোনালদো সেখানে এখনও জাতীয় দলে নিজের জায়গা ধরে রেখে অবদান রাখতে চান।
সাফল্যের মুকুট পরে বিদায়ের পথে মেসি
ফুটবল ইতিহাসে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য মেসির আর খুব বেশি কিছু বাকি নেই। আটটি ব্যালন ডি’অর, বিশ্বকাপ ও দুটি কোপা আমেরিকা—দেশ ও ক্লাব ফুটবলে তার অর্জনের তালিকা দীর্ঘ। বিশেষ করে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয় আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করে।
ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর অনেকেই মনে করেছিলেন, ইউরোপীয় ফুটবল থেকে দূরে সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেসির প্রভাবও কমে যাবে। কিন্তু বয়স বাড়লেও বড় মঞ্চে নিজের সামর্থ্য দেখিয়ে গেছেন তিনি।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির উপস্থিতি তাই কখনোই কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অধিনায়ক হিসেবে তিনি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অবদান রেখেছেন এবং সমর্থকদের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন এক বিশেষ সম্পর্ক।
এখন সেই সম্পর্কেরই আবেগঘন সমাপ্তির প্রস্তুতি চলছে। বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচকে ঘিরে মেসিকে বিদায় জানানোর আয়োজন করা হচ্ছে। টিকিটের বিপুল চাহিদাও সমর্থকদের আগ্রহের চিত্র তুলে ধরেছে।
আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও তাদের অধিনায়ককে বিশেষভাবে সম্মান জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই উপলক্ষে বিশেষ জার্সিসহ নানা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে জাতীয় দলের সঙ্গে মেসির সম্পর্ক একেবারে শেষ হয়ে যাবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা থেকেই যাচ্ছে। ভবিষ্যতে কোনোভাবে জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার সম্ভাবনাও নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।
এখনই শেষ চান না রোনালদো
মেসির মতো বিদায়ের পথে হাঁটতে এখনও প্রস্তুত নন রোনালদো। বয়স বাড়লেও পর্তুগালের হয়ে খেলে যাওয়ার ইচ্ছা তার স্পষ্ট। তবে জাতীয় দলে তার ভূমিকা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্নও উঠছে।
শুরুর একাদশে তার উপস্থিতি আগের তুলনায় কমে এসেছে। ফলে দলের জন্য রোনালদোর ভূমিকা কী হওয়া উচিত, সেটি নিয়ে আলোচনা চলছে। রোনালদো নিজে অবশ্য বিশ্বাস করেন, এখনও জাতীয় দলের জন্য তার অনেক কিছু দেওয়ার আছে।
গত আগস্টে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রোনালদো ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ফুটবলে চলতি বছরটিই হয়তো তার শেষ বছর হতে পারে। একইসঙ্গে নিজের ক্যারিয়ারের উপযোগী একটি স্মরণীয় উত্তরাধিকার রেখে যেতে চান বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
তবে জাতীয় দলের ক্ষেত্রে অবসরের সিদ্ধান্ত এখনও নেননি এই পর্তুগিজ তারকা।
সাম্প্রতিক ম্যাচে তার বেঞ্চে থাকা অবশ্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নরওয়ের বিপক্ষে পর্তুগালের ম্যাচে পুরো সময় বেঞ্চে ছিলেন রোনালদো। পর্তুগাল ২-১ গোলে জয় পেলেও ম্যাচ শেষে রোনালদোর প্রতিক্রিয়াই হয়ে ওঠে আলোচনার অন্যতম বিষয়।
শেষ বাঁশি বাজার পর তিনি দ্রুত ড্রেসিংরুমের দিকে চলে যান। সতীর্থদের সঙ্গে জয় উদযাপন কিংবা সমর্থকদের অভিবাদন জানানোর দৃশ্য দেখা যায়নি। তার এই আচরণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়।
রোনালদোর সঙ্গে কোচের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ক্লাব পর্যায়ে একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকায় কোচ তার সামর্থ্য ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত। ম্যাচের পর কোচও স্বীকার করেন, রোনালদোর সঙ্গে তার কথা বলা প্রয়োজন।
তবে বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—অন্য সব খেলোয়াড়ের মতো রোনালদোরও একাদশে জায়গা নির্ভর করবে তার পারফরম্যান্স ও দলের প্রয়োজনের ওপর।
একই প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভিন্ন সমাপ্তি
মেসি ও রোনালদোর ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। একজন দেশের হয়ে নিজের প্রায় সব বড় স্বপ্ন পূরণ করে বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্যজন এখনও জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নিজের অবদান অব্যাহত রাখতে চান।
দীর্ঘদিন ধরে এই দুই তারকা ছিলেন একে অপরের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। ব্যালন ডি’অর, গোল, শিরোপা কিংবা ব্যক্তিগত রেকর্ড—প্রায় প্রতিটি আলোচনাতেই পাশাপাশি উচ্চারিত হয়েছে তাদের নাম।
সময় বদলেছে, বয়স বেড়েছে, বদলেছে তাদের ক্যারিয়ারের প্রেক্ষাপটও। কিন্তু তাদের সেই ঐতিহাসিক দ্বৈরথের আকর্ষণ এখনও শেষ হয়নি।
মেসি এখন আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের অর্জনগুলো উদযাপনের মধ্য দিয়ে বিদায়ের দিকে এগোচ্ছেন। আর রোনালদো এখনও বিদায় শব্দটিকে সামনে রাখতে নারাজ। তার বিশ্বাস, মাঠে দেওয়ার মতো এখনও অনেক কিছু বাকি।
দুজনের পথ তাই আলাদা হলেও গল্পের শেষটা একই জায়গায় এসে মিলছে—বিশ্ব ফুটবলের দুই মহাতারকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন তাদের ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের দিকে।
-স্বাধীন/এস
মেসি-রোনালদোর শেষ অধ্যায়: বিদায়ের পথে দুজন, পথ আলাদা

