উত্তরপত্রে সাদা কাগজ কাণ্ড: চার বিষয়ে শূন্য পেয়ে বোর্ড চ্যালেঞ্জে পাস
রংপুর ব্যুরো: গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের ভোকেশনাল মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (ভোকেশনাল এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তরপত্র পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। চার বিষয়ে শূন্য নম্বর পেয়ে বোর্ড চ্যালেঞ্জ করার পর পাস করেছে এক শিক্ষার্থী। ফলে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এই চারটি বিষয়ের উত্তরপত্রে কোনো লেখা না থাকায় নম্বর না পেয়ে পরীক্ষার ফলাফলে অকৃতকার্য হন এক পরীক্ষার্থী। পরে বোর্ড চ্যালেঞ্জ করে পাস করার ঘটনায় পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র সংরক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগে জানা যায়, উপজেলার ধর্মপুর এসআইডি ভোকেশনাল মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কারিগরি কলেজের শিক্ষার্থী আল রিশাদ মুগ্ধ ২০২৬ সালের ভোকেশনাল স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় এসআইডি পরীক্ষা কেন্দ্রে অংশগ্রহণ করেন।
এসআইডি ভোকেশনাল মাধ্যমিক ও কারিগরি কলেজের ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট ও কেন্দ্রসচিব মঞ্জুয়ারা বেগমের সঙ্গে শপ অ্যাসিস্ট্যান্ট মাহিদুল ইসলাম ও তার ভাবি আনজুয়ারা বেগমের আদালতে মামলা-মোকদ্দমা চলে আসছে। এরই জের ধরে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মাহিদুল ইসলামের ছেলে আল রিশাদ মুগ্ধের উত্তরপত্রে কারসাজি করার অভিযোগ উঠেছে।
গত ১০ আগস্ট ২০২৬ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আল রিশাদ মুগ্ধ অকৃতকার্য হন। ফলাফল ও নম্বরপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অন্যান্য বিষয়ে সন্তোষজনক নম্বর পেলেও বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে কোনো নম্বর পাননি।
গত ১১ আগস্ট বোর্ডে খাতা চ্যালেঞ্জের আবেদন করে ১৩ আগস্ট পরীক্ষার্থী ও তার পিতা বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে উপস্থিত হন। এ সময় উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী জাকারিয়া আব্বাসী চারটি বিষয়ের উত্তরপত্রে কোনো লেখা নেই এবং সাদা কাগজ রয়েছে বলে জানান।
পরবর্তীতে ১০ সেপ্টেম্বর বোর্ড চ্যালেঞ্জের ফলাফল ঘোষণা করা হলে দেখা যায়, বাংলা বিষয়ে ১৩০, ইংরেজিতে ১৩১, গণিতে ১৬৫ এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে ১১৭ নম্বর পেয়ে জিপিএ ৪.৬৫ নিয়ে কৃতকার্য হয়েছে আল রিশাদ মুগ্ধ।
ফেল করা চার বিষয়ে পরীক্ষার্থী পাস করায় এ ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পরীক্ষার্থীর লেখা উত্তরপত্র কীভাবে সাদা কাগজে পরিণত হলো? এছাড়া বোর্ড চ্যালেঞ্জের পর ফলাফল কোন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন হলো এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মূল উত্তরপত্র সরিয়ে সাদা খাতা ঢোকানোর মতো ঘটনা ঘটে থাকলে এটি শুধু পরীক্ষার্থীর ফলাফল-সংক্রান্ত বিষয় নয়; পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে জড়িত। এ ঘটনায় পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে উত্তরপত্র বোর্ডে পাঠানো পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি, উত্তরপত্র গ্রহণ ও সংরক্ষণকারী কর্মকর্তা এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কেন্দ্রসচিব মঞ্জুয়ারা বেগম ও পরীক্ষা কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজু মিয়া, হামিদুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, সফিউল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শিক্ষা সচিব, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক, সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন আল রিশাদ মুগ্ধের পিতা মাহিদুল ইসলাম।
উত্তরপত্র পরিবহন, গ্রহণ, সংরক্ষণ, বাছাই ও মূল্যায়নের প্রতিটি ধাপে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে অভিযোগকারী পক্ষ মনে করছে।
শিক্ষানুরাগী মহলের মতে, একজন পরীক্ষার্থীর চারটি বিষয়ের উত্তরপত্রে লেখা না থাকা এবং পরবর্তীতে বোর্ড চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে পাস করার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়। পরীক্ষা কেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ, উত্তরপত্রের প্যাকেট ও সিল, প্রেরণ রেজিস্টার, উত্তরপত্রের কভার সেলাই ও স্ট্যাপলিংয়ের ধরন যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘটনাটি তদন্ত করে প্রকৃতপক্ষে উত্তরপত্রে কীভাবে কারসাজি হয়েছিল এবং এর জন্য কারা দায়ী এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
কেন্দ্রসচিব মঞ্জুয়ারা বেগমের কাছে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “উত্তরপত্রে কারসাজির ব্যাপারে আমি জানি না।” কেন্দ্রসচিব হিসেবে আপনি এর দায়িত্ব এড়াতে পারেন না এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
সাদা উত্তরপত্রে শিক্ষার্থী পাস করার বিষয়ে তিনি বলেন, “ফেল করা পরীক্ষার্থীকে বোর্ড কর্তৃপক্ষ কীভাবে পাস করে দিয়েছে, সেটা আমার জানা নেই।”
জেলা শিক্ষা অফিসার আতাউর রহমানের কাছে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আমরা দেখাশোনা করি না। সে কারণে কোনো মন্তব্য নেই।”
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইফফাত জাহান তুলি ক্ষুদে বার্তায় জানান, “খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
-স্বাধীন/এমএ
উত্তরপত্রে সাদা কাগজ কাণ্ড: চার বিষয়ে শূন্য পেয়ে বোর্ড চ্যালেঞ্জে পাস

