অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে বাড়ছে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি

প্রকাশঃ Sep 30, 2026 - 17:12
অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে বাড়ছে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি

অস্বাভাবিক জীবনধারা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশই হয়েছে হৃদরোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগে।

দেশে প্রায় ৫২ শতাংশ পুরুষ ধূমপান করেন এবং প্রতি পাঁচজনের একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। ২০২১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই বছর দেশে এক কোটি ৩১ লাখের বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন এবং এ রোগে মৃত্যু হয়েছে ৭৫ হাজার ৬১৭ জনের।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘রংপুর জেলার মানুষের খাদ্য বৈচিত্র্যতা এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য ফলিত পুষ্টি’ শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বারটান), রংপুরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ছাদেকুল ইসলাম প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন।

রংপুরে খাদ্যাভ্যাসে ঘাটতি

সেমিনারে জানানো হয়, রংপুরের মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রায় ৬৭ শতাংশই দানাদার খাদ্য। একজন ব্যক্তির প্রতিদিন ৫ গ্রাম লবণ খাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে গড়ে ১১ গ্রাম লবণ খাওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে প্রতিদিন ২০ গ্রাম চিনি গ্রহণের সুপারিশ থাকলেও গ্রহণের পরিমাণ মাত্র ৫ গ্রাম।

শাকসবজি ও ফলমূল প্রতিদিন ৪০০ গ্রাম খাওয়ার কথা থাকলেও রংপুরে গড়ে খাওয়া হচ্ছে ৩১৭ গ্রাম।

তবে কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক চিত্রও রয়েছে। জেলার শতভাগ মানুষ নিরাপদ উৎসের পানি ব্যবহার করছেন। প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা রয়েছে। ৯৬ শতাংশ পরিবারের হাত ধোয়ার স্থানে পানি ও সাবানের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া ৫৯ শতাংশ পরিবার আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করে।

অতিরিক্ত লবণ ও অপর্যাপ্ত পুষ্টিতে বাড়ছে ঝুঁকি

ড. ছাদেকুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর অন্যতম কারণ। এতে স্ট্রোক ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ে। একইভাবে ফলমূল, বাদাম, বীজ, শাকসবজি, সামুদ্রিক উৎসের ওমেগা-৩ এবং আঁশজাতীয় খাবারের অপর্যাপ্ত গ্রহণও অকালমৃত্যুর বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

সেমিনারে আরও জানানো হয়, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ খাদ্যাভ্যাস-সম্পর্কিত মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি মৃত্যু হৃদরোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। খাদ্যাভ্যাসের কারণে প্রতি পাঁচজনের একজনের আয়ু কমে যাচ্ছে বলেও সেমিনারে উল্লেখ করা হয়।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ

সুস্থ জীবনধারা ও উত্তম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দেশে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে সেমিনারে জানানো হয়। রোগ নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা না থাকায় দেশের রোগের প্রকৃত চিত্র অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়। এছাড়া প্রায় ৬০ শতাংশ সরকারি হাসপাতালে রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই বলে সেমিনারে উল্লেখ করা হয়।

দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে ১৫২টি আইন ও নীতিমালা থাকলেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের নমুনা পরীক্ষায় ৩৩ শতাংশ নমুনা অনিরাপদ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে বলেও জানানো হয়।

নতুন প্রজন্মকে সচেতন করার আহ্বান

বারটানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আব্দুর রাজ্জাকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান। বিশেষ অতিথি ছিলেন সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বলেন, নতুন প্রজন্মের পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে এখন থেকেই সচেতনতা বাড়াতে হবে। আগের প্রজন্মের সময়ে পুষ্টি বিষয়ে প্রচারণা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম তুলনামূলক কম থাকায় অনেক অভিভাবক স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পাননি।

তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্মের সামনে অস্বাস্থ্যকর, প্রক্রিয়াজাত ও কৃত্রিম উপাদানযুক্ত খাবারের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। শিশু ও তরুণদের পুষ্টি বিষয়ে সচেতন করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

খাদ্যের পুষ্টিমান নিশ্চিত করতে পুরো ব্যবস্থায় নজর

সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, খাদ্যের পুষ্টিমান নিশ্চিত করতে শুধু খাবার গ্রহণের দিকে নজর দিলেই হবে না। মাটি থেকে শুরু করে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রান্না এবং খাবার প্লেটে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পুষ্টিগুণ ধরে রাখতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা কী খাচ্ছি, তার পাশাপাশি সেই খাবার থেকে শরীর পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে পুরো খাদ্যব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমান বজায় রাখা জরুরি। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এর ফলে শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর আর্থিক চাপও তৈরি হয়।

তিনি সুস্থ থাকতে সবাইকে স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

বারটানের আয়োজনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি এবং শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ৫০ জন কর্মকর্তা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, ভেজাল খাদ্য বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে অভিযান এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।

-স্বাধীন/এস

অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে বাড়ছে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি
লোগো
Sep 30, 2026

অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে বাড়ছে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি

লোগো
বিস্তারিত কমেন্টে
shadhindiganta.com
/ Shadhin Diganta