শহীদ স্মৃতি কলেজে নিয়োগ বিতর্ক
অফিস সহকারী পদে ছাত্রলীগ নেতার প্রাথমিক নির্বাচন
নেছারাবাদ প্রতিনিধি, পিরোজপুর: পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজের সাম্প্রতিক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে আলোচনা-সমালোচনা ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের উপজেলা কমিটির প্রচার সম্পাদক হিসেবে পরিচিত নাঈমুর রহমান মারুফ ওরফে মো. মারুফকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
গত ৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে কলেজের সাতটি শূন্য পদের বিপরীতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিভিন্ন পদে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। তবে প্রকাশিত তালিকায় আলোচিত ওই প্রার্থীর নাম থাকায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
সাত পদে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত যারা কলেজ কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে মো. মারুফ (পিতা: মহিউদ্দিন), ল্যাব সহকারী (আইসিটি) পদে মো. বেল্লাল (পিতা: মো. ফারুক হোসেন), ল্যাব সহকারী (পদার্থবিজ্ঞান) পদে মো. তাওহীদুল ইসলাম (পিতা: মো. সেলিম হোসেন) এবং ল্যাব সহকারী (উদ্ভিদবিজ্ঞান) পদে মো. হারিসুল ইসলাম (পিতা: মো. দেলোয়ার হোসেন) প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়েছেন।
এ ছাড়া অফিস সহায়ক পদে রাশেদুল ইসলাম (পিতা: আব্দুস সালাম) ও মোসা. আইরিন আক্তার বিধি (পিতা: মো. আব্বাস উদ্দিন আহমেদ) এবং নিরাপত্তাকর্মী পদে মো. সাফাত (পিতা: মো. দেলোয়ার হোসেন) প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়েছেন।
অন্যদিকে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় ওই পদের নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ছাত্রলীগের পদে থাকার অভিযোগ, নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত মো. মারুফের রাজনৈতিক পরিচয় ও পূর্ববর্তী কর্মসংস্থান নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে ওই পদে মাস্টাররোলে কাজ করে আসছেন। একই সঙ্গে তাঁকে ছাত্রলীগের নেছারাবাদ উপজেলা কমিটির প্রচার সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে তাঁর প্রাথমিক নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় সচেতন মহলের কেউ কেউ। তাঁদের মতে, নিয়োগের ক্ষেত্রে সব প্রার্থীর যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষার ফলাফল যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রকৃত সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা, নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল এবং প্রযোজ্য বিধিমালা অনুযায়ী তাঁর যোগ্যতা যাচাই করা জরুরি।
অধ্যক্ষের বক্তব্য: নিয়োগ হয়েছে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজে গিয়ে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে আলোচিত প্রার্থীকে উপস্থিত দেখা যায় বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ মাসুদ কামাল হাওলাদার বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং ফলাফল কলেজের নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রেখেছেন।
তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য পরীক্ষার নম্বর, মূল্যায়নপদ্ধতি, নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র এবং প্রযোজ্য বিধিমালা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
চূড়ান্ত নিয়োগের আগে মেডিকেল ও ডোপ টেস্ট
কলেজ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকাশিত তালিকাটি প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের তালিকা। পরবর্তী সময়ে মেডিকেল পরীক্ষা ও ডোপ টেস্টের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর গভর্নিং বডি চূড়ান্ত নিয়োগপত্র দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
ফলে প্রাথমিক তালিকায় নাম থাকা মানেই চূড়ান্ত নিয়োগ নিশ্চিত হওয়া নয়। চূড়ান্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব শর্ত ও বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল, প্রার্থীদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন এবং চূড়ান্ত নিয়োগের শর্ত সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হলে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা, শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর নিরপেক্ষ পর্যালোচনা হবে এবং যোগ্যতা ও বিধিবিধানের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সুনাম অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও বজায় থাকবে।
অফিস সহকারী পদে ছাত্রলীগ নেতার প্রাথমিক নির্বাচন

