প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর হবে পারস্পরিক আস্থা অর্জনের পর: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

প্রকাশঃ Aug 20, 2026 - 13:11
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর হবে পারস্পরিক আস্থা অর্জনের পর: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, তাড়াহুড়ো করে নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, কূটনৈতিক আলোচনা এবং মর্যাদাপূর্ণ আমন্ত্রণের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর হতে পারে।

তিনি বলেন, আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে নানা আলোচনা থাকলেও বাংলাদেশ এ মুহূর্তে কোনো তাড়াহুড়ো করতে চায় না। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করা হচ্ছে।

তবে দুই দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় ঐকমত্য ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে ঢাকা ইতিবাচক থাকবে বলে জানান তিনি।

গত ১৭ আগস্ট রাজধানীর মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন হুমায়ুন কবির। সাক্ষাৎকারে তিনি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগ, আঞ্চলিক জোট, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্য এবং সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

ভারত সফর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান

ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রধানমন্ত্রীর সফরসংক্রান্ত খবরকে অনুমাননির্ভর বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তার মতে, দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের পরিবেশ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ভারতকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে হবে। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত সরকারের সঙ্গে ভারত কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

তার ভাষায়, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশ ছাড়া কোনো শীর্ষ পর্যায়ের সফরে তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। সুনির্দিষ্ট বিষয়ে ঐকমত্য এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণ নিশ্চিত হলে সফরের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের ভূমিকা

বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক ব্যক্তিদের ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক কার্যক্রম বা গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন হুমায়ুন কবির।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হলে তা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে ভারতের কাছে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে ভারসাম্য

বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা উল্লেখ করেন উপদেষ্টা। তিনি জানান, জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে।

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নিয়েও বাংলাদেশ আগ্রহের সঙ্গে কাজ করছে। সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রিয়াদ সফরের প্রস্তুতিও এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক

অর্থনৈতিক কূটনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সয়াবিন আমদানি, বোয়িং বিমান কেনা এবং সামগ্রিক বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা চলছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ট্রেড অ্যান্ড পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট নিয়েও আলোচনা এগোচ্ছে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং ‘টু প্লাস টু’ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ আরও জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আফ্রিকায় নতুন বাজারের সন্ধান

আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে অর্থনৈতিকভাবে আরও কাজে লাগানোর পরিকল্পনার কথাও জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে কৃষি, কন্ট্রাক্ট ফার্মিং এবং বাংলাদেশি পণ্যের নতুন বাজার তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের আফ্রিকা সফরের প্রস্তুতিও চলছে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে আশাবাদ

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। দুই দেশের সরকারপ্রধানের ইতিবাচক মনোভাব এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফলে জটিলতা কমছে বলে জানান তিনি।

তার আশা, খুব শিগগিরই বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথ আবারও উন্মুক্ত হবে।

জাতিসংঘ ও রোহিঙ্গা সংকট

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচনে বাংলাদেশের সাফল্যকে সরকারের কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে তুলে ধরেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, এই প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের নীতিভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্বমঞ্চে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা হবে।

একই সঙ্গে মিয়ানমারসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ওপর কূটনৈতিক ও আর্থিক চাপ বাড়িয়ে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানের প্রচেষ্টা চালানো হবে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টার মতে, সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে একটি সুসংগঠিত পররাষ্ট্রনীতি কাঠামো তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও সার্বভৌম মর্যাদা আরও শক্তিশালী করাই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হুমায়ুন কবির

হুমায়ুন কবিরের পররাষ্ট্রনীতির অভিজ্ঞতার বড় অংশ যুক্তরাজ্যকেন্দ্রিক। তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে পড়াশোনা করার পর লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং লিডস ল’ স্কুলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।

পেশাগত জীবনে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, লিজ ট্রাস ও ঋষি সুনাকের সরকারের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। লিজ ট্রাসের প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

স্বাধীন/ এমএ

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর হবে পারস্পরিক আস্থা অর্জনের পর: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
লোগো
Aug 20, 2026

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর হবে পারস্পরিক আস্থা অর্জনের পর: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

লোগো
বিস্তারিত কমেন্টে
shadhindiganta.com
/ Shadhin Diganta