পাম্পে তেল নেই, কাবুলের নিয়ন্ত্রণাধীন স্টেশনে বরাদ্দের কয়েকগুণ!
খুলনার জন্য বরাদ্দ তেলের বড় একটি অংশ প্রভাব খাটিয়ে একাই গিলে খাচ্ছেন বাংলাদেশ ট্যাংক লরী ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন খুলনা বিভাগীয় শাখার সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল কবির কাবুল—এমন অভিযোগ উঠেছে। অনেক পাম্প মালিককে বঞ্চিত করে দিনে বরাদ্দের কয়েকগুণ তেল উত্তোলন করছেন তিনি। পরে সেই তেল বেশি দামে কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চাহিদামতো তেল না দিলে ডিপো ম্যানেজারকেও হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। নানা ছুতোয় ধর্মঘট ডাকার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, কাবুলকে ঘিরে খুলনায় একটি দুষ্ট তেল চক্র গড়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়ছে পুরো জ্বালানি খাতে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সাবেক এমপি এসএম কামাল হোসেনের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এই ব্যবসায়ীকে বর্তমান সরকারের লোকজনও সরাতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো না কোনোভাবে ম্যানেজ করে তিনি নিজের প্রভাব ধরে রেখেছেন বলেও দাবি ব্যবসায়ীদের।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাবুল সাধারণত যমুনা ডিপো থেকে তেল উত্তোলন করেন। ওই ডিপোর চার্ট হিসাব করে দেখা গেছে, ডিলারদের জন্য নির্ধারিত তেল বরাদ্দের বড় অংশই যাচ্ছে তার নির্ধারিত পাম্পগুলোর জন্য।
সরকারের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আগের বছর যে পরিমাণ তেল উত্তোলন করা হয়েছিল, সেই হিসাবেই পরবর্তী সময়ে তেল বরাদ্দ পাওয়ার কথা। কিন্তু কাবুলের নিয়ন্ত্রণাধীন পাম্পগুলো সেই নিয়ম মানছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
কাবুলের নিয়ন্ত্রণাধীন আটটি পাম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করেও গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে তেল উত্তোলনের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাওয়ার চিত্র পাওয়া গেছে।
২০২৫ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত মেসার্স আইয়ুব হোসেন অ্যান্ড কোং স্টেশন ১৯ হাজার ৫০০ লিটার পেট্রোল উত্তোলন করলেও চলতি বছর উত্তোলন করেছে ১ লাখ ৬৭ হাজার লিটার। একই সময়ে গত বছর ৬১ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল নিলেও চলতি বছর নিয়েছে ৪ লাখ ১৬ হাজার লিটার।
মেসার্স করিম ফিলিং স্টেশন ২০২৫ সালে ১৬ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন, ২০ হাজার ৫০০ লিটার পেট্রোল এবং ৪৫ হাজার লিটার ডিজেল নিয়েছিল। চলতি বছরে এসব পণ্যের উত্তোলন বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১ লাখ ২২ হাজার, ৮৬ হাজার ও ৪ লাখ ১৯ হাজার লিটার।
রজনীগন্ধা ফিলিং স্টেশনও গত বছরের তুলনায় এবার বেশি তেল নিয়েছে। ২০২৫ সালে স্টেশনটি ৪৬ হাজার লিটার অকটেন, ৬৮ হাজার ৫০০ লিটার পেট্রোল এবং ১ লাখ ২৩ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল নিয়েছিল। চলতি বছরে তা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার লিটার অকটেন, ১ লাখ ২০ হাজার লিটার পেট্রোল এবং ৪ লাখ ৩৮ হাজার লিটার ডিজেল।
মেসার্স যশোর ফিলিং স্টেশন গত বছর ৭৩ হাজার লিটার অকটেন, ১ লাখ ২৮ হাজার লিটার পেট্রোল ও ৫ লাখ ১১ হাজার লিটার ডিজেল নিয়েছে। চলতি বছরে স্টেশনটি নিয়েছে ৮৫ হাজার লিটার অকটেন, ১ লাখ ৩৩ হাজার লিটার পেট্রোল এবং প্রায় ৭ লাখ লিটার ডিজেল।
এ ছাড়া সুলতানা ফিলিং স্টেশন গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩৫ হাজার লিটার বেশি পেট্রোল এবং ৪০ হাজার লিটার বেশি ডিজেল নিয়েছে। কেশবপুর ফিলিং স্টেশন এ বছর অকটেন ১ লাখ ৬৩ হাজার লিটার, পেট্রোল ১৪ লাখ ২৫ হাজার লিটার এবং ডিজেল সাড়ে ৪ লাখ লিটার বেশি নিয়েছে। দেশ ফিলিং স্টেশন প্রায় ১ লাখ লিটার বেশি পেট্রোল এবং দেড় লাখ লিটার বেশি ডিজেল নিয়েছে। কাশিয়ানি ফিলিং স্টেশনও ৬০ হাজার লিটার বেশি পেট্রোল ও ১ লাখ লিটার বেশি ডিজেল নিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, বিপুল পরিমাণ তেল তুলে পরে তা কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। ব্যারেলে করে এই তেল চলে যাচ্ছে প্রত্যন্ত এলাকার খুচরা বিক্রেতাদের কাছে। পরে গ্রামের কৃষক ও প্রান্তিক গ্রাহকদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে সেই তেল।
অথচ খুলনার অনেক পাম্প মালিক সংকটের সময় প্রয়োজনীয় তেল তুলতে পারছেন না। শহরের অভ্যন্তরে এলেনা পাম্প, আল আরাফা পাম্প, ভিআইপি ফিলিংসহ অন্তত ৭০টি স্টেশন চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় ডিলারদের তেলও সমিতির নেতারা নিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
যমুনা ডিপোর প্যাক পয়েন্ট ডিলার (পিপিডি) ও বাংলাদেশ ফুয়েলের স্বত্বাধিকারী জুয়েল এবং দিঘলিয়ার কালাম জানান, সারা দেশের ডিলাররা তেল পেলেও খুলনায় ডিলারদের তেল দেওয়া হচ্ছে না। পাম্প মালিকসহ সমিতির নেতারা ইচ্ছামতো তেল উত্তোলন করে নিয়ে যাচ্ছেন। পাম্প থেকে ব্যারেলের মাধ্যমে তাদের ক্রেতাদের কাছে তেল বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
তাদের ভাষায়, এভাবে চলতে থাকলে তাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
তবে বেশি তেল নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল কবির কাবুল। তিনি বলেন, নিয়ম মেনেই তেল নেওয়া হয়েছে এবং সেভাবেই বিপণন করা হয়েছে। এজেন্সির তেল নেওয়ার পাশাপাশি তৃণমূলের লোকজনকেও তেল দিতে হয়েছে। তার দাবি, তিনি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেননি এবং টাকা দিয়ে তেল নিয়েছেন, বিনা মূল্যে নেননি। কেউ তেল পায়নি—এমন অভিযোগও নেই বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে যমুনা অয়েল কোম্পানির সেলস অফিসার মোস্তাক আহমেদ বলেন, অ্যাসোসিয়েশন থেকে সভাপতি নির্দিষ্ট কিছু পাম্পের জন্য চাহিদা পাঠান। সেই অনুযায়ী তেল না দিলে নানা ধরনের হুমকি আসে। সাম্প্রতিক সময়ে কোনো কারণ ছাড়াই ধর্মঘট পালনের মতো কর্মসূচিও দিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন।
তার দাবি, ডিপো থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অনেকটা ব্যবসায়িক সংগঠন ও জ্বালানি শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের কাছে জিম্মি।
এদিকে অ্যাসোসিয়েশনের কমিটি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ২০২৪ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ-সদস্য এসএম কামাল হোসেন তার আশীর্বাদপুষ্টদের দিয়ে সংগঠনটির খুলনা বিভাগীয় কমিটি গঠন করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সভাপতি হন সৈয়দ সাজ্জাদুল কবির কাবুল এবং সাধারণ সম্পাদক হন সুলতান মাহমুদ পিন্টু।
পিন্টুর বিরুদ্ধে হত্যাসহ ১৪টি মামলা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো নির্বাচন ছাড়াই তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠদের সমন্বয়ে ওই কমিটি গঠন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। বর্তমান কমিটির তালিকার নিচে কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো অনুমোদন বা স্বাক্ষরও নেই বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে খুলনায় তেল উত্তোলন ও সরবরাহ ঘিরে প্রভাবশালী একটি চক্রের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। একদিকে বিপুল পরিমাণ তেল উত্তোলনের তথ্য, অন্যদিকে কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ এবং অনেক পাম্পে তেল সংকট—সব মিলিয়ে খুলনার জ্বালানি খাত নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
-স্বাধীন/এস
পাম্পে তেল নেই, কাবুলের নিয়ন্ত্রণাধীন স্টেশনে বরাদ্দের কয়েকগুণ!

