রাশিয়ার নতুন ‘গেরান-৫’ ড্রোন: ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জ

প্রকাশঃ Sep 21, 2026 - 19:04
রাশিয়ার নতুন ‘গেরান-৫’ ড্রোন: ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জ

ঘণ্টায় প্রায় ৬০০ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে সক্ষম রাশিয়ার নতুন প্রজন্মের ‘গেরান-৫’ জেটচালিত ড্রোন ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। প্রায় ৬ হাজার মিটার উচ্চতায় উড়তে সক্ষম এসব ড্রোনের উচ্চ গতি, দীর্ঘ পাল্লা এবং বিপুল সংখ্যায় ব্যবহারের কারণে প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়ছে চাপ। একই সঙ্গে ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইলের মধ্যকার পার্থক্যও অনেকটা অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো ক্যাটরিনা বন্ডারের মতে, ‘গেরান-৫’ মূলত ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের রুশ সংস্করণের ধারাবাহিক উন্নত রূপ। রাশিয়ার আলাবুগা অঞ্চলে এসব ড্রোনের ব্যাপক উৎপাদন হচ্ছে বলে তিনি জানান। নতুন জেটচালিত সংস্করণগুলো আগের পিস্টন-ইঞ্জিনচালিত মডেলের তুলনায় অনেক বেশি গতিসম্পন্ন।

বন্ডারের তথ্য অনুযায়ী, সংস্করণভেদে এসব ড্রোনের পাল্লা প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার থেকে ৯৫০ কিলোমিটারের বেশি হতে পারে। সাধারণ মডেলগুলো ঘণ্টায় ৩০০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার গতিতে উড়লেও ‘গেরান-৪’ প্রায় ৫০০ কিলোমিটার এবং ‘গেরান-৫’ প্রায় ৬০০ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় নতুন চাপ

ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক ধীরগতির, প্রোপেলারচালিত ড্রোন মোকাবিলার উপযোগী করে গড়ে উঠেছিল। মেশিনগান, গান-ট্রাক এবং তুলনামূলক কম খরচের ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ব্যবহার করে আগে শাহেদ ড্রোনের বড় অংশ ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছিল।

কিন্তু জেটচালিত গেরান ড্রোনের গতি ও উচ্চতা সেই কৌশলকে কঠিন করে তুলছে। বন্ডারের মতে, ইউক্রেনের প্রচলিত ইন্টারসেপ্টর ড্রোনগুলোর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার। ফলে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে চলা লক্ষ্যবস্তুকে ধাওয়া করে ধ্বংস করা কঠিন।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তি। নতুন গেরান ড্রোনে এমন প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে, যা হামলার শেষ পর্যায়ে ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের ভিডিও বা যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত করতে পারে।

ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার ইউরি চেরেভাশেস্কোর মতে, এসব ড্রোনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এগুলোর নিয়ন্ত্রিত উড্ডয়ন। অপারেটরের নির্দেশ অনুযায়ী ড্রোনের গতিপথ ও উচ্চতা পরিবর্তন করা সম্ভব।

বিপুল সংখ্যায় হামলাই বড় কৌশল

গেরান-৫-এর সক্ষমতার পাশাপাশি বিপুল সংখ্যায় ড্রোন ব্যবহারের কৌশলও রাশিয়ার হামলাকে আরও জটিল করে তুলছে।

বন্ডারের তথ্য অনুযায়ী, জুনে রাশিয়া প্রায় ৪৫০টি জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার করলেও আগস্টে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৮৫০টিতে পৌঁছায়। এসব হামলার অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত ড্রোনের প্রায় ৭০ শতাংশ জেটচালিত ছিল বলে তিনি জানান।

বিপুল সংখ্যায় ড্রোন একসঙ্গে পাঠানো হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ৮০০টি ড্রোনের ৯০ শতাংশ ধ্বংস করা গেলেও ৮০টি ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারে।

এ ছাড়া ডিকয়, বিভিন্ন দিক থেকে হামলা এবং উচ্চতা পরিবর্তনের মতো কৌশল ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবস্থান শনাক্ত ও সেটিকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

কিংস কলেজ লন্ডনের ড্রোন বিশেষজ্ঞ জেমস প্যাটন রজার্সের মতে, গেরান-৫ ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোনের বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তুলনামূলক কম খরচে বেশি গতি ও দীর্ঘ পাল্লার সক্ষমতা থাকায় এগুলো দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক হামলা চালানো সম্ভব।

নতুন প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা

জেটচালিত ড্রোন মোকাবিলায় ইউক্রেন নতুন প্রজন্মের ইন্টারসেপ্টর ড্রোন তৈরির চেষ্টা করছে। তবে ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে উড়তে সক্ষম এসব ইন্টারসেপ্টর নিয়ন্ত্রণ করাও প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন।

এ কারণে ইউক্রেন কম খরচের গাইডেড মিসাইল, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং দ্রুতগতির ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারের পাশাপাশি ড্রোনের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় আঘাত করার কৌশলও বিবেচনা করছে।

বন্ডারের মতে, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোনো একটি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। জেটচালিত ইন্টারসেপ্টর, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবহার প্রয়োজন।

বদলে যাচ্ছে ড্রোন যুদ্ধের অর্থনীতি

বিশ্লেষকদের মতে, গেরান-৫-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য শুধু এর গতি বা প্রযুক্তি নয়; বরং তুলনামূলক কম খরচে দীর্ঘপাল্লার হামলা চালানোর সক্ষমতা।

বন্ডার গেরান-৫-কে কার্যত একটি ‘স্বল্পমূল্যের ক্রুজ মিসাইল’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, বিপুলসংখ্যক ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের বিমান প্রতিরক্ষাকে ব্যস্ত ও দুর্বল করা যায়। একই সময়ে ব্যয়বহুল ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা সম্ভব।

ড্রোন বিশেষজ্ঞ জেমস প্যাটন রজার্সের মতে, ভবিষ্যতের বিমান প্রতিরক্ষার অন্যতম বড় শিক্ষা হলো—শুধু উন্নত ইন্টারসেপ্টর তৈরি করলেই হবে না। বিপুলসংখ্যক ড্রোনকে কম খরচে প্রতিহত করার সক্ষমতা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করার সামর্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাই ভবিষ্যতের বিমান প্রতিরক্ষা ও ড্রোন যুদ্ধের কৌশল নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি

-স্বাধীন/এস

রাশিয়ার নতুন ‘গেরান-৫’ ড্রোন: ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জ
লোগো
Sep 21, 2026

রাশিয়ার নতুন ‘গেরান-৫’ ড্রোন: ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জ

লোগো
বিস্তারিত কমেন্টে
shadhindiganta.com
/ Shadhin Diganta