এক নজরে মির্জা ফখরুলের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

প্রকাশঃ Aug 14, 2026 - 01:58
এক নজরে মির্জা ফখরুলের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আর এজন্য ইতোমধ্যে দলীয় সব পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভা শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

তিনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ায় দলের মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মির্জা ফখরুল।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, আজই (বৃহস্পতিবার) নির্বাচন কমিশনে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তফসিল অনুযায়ী, দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিকেল ৪টা। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই করা হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৮ আগস্ট। ভোটগ্রহণ হবে ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে।

এদিকে, জাতীয় সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন, এটা অনেকটাই পরিষ্কার। আর তিনি রাষ্ট্রপতি হলে দল ও সরকারে ফাঁকা হয়ে যাবে তিনটি পদ।

ঠাকুরগাঁওয়ের শান্ত জনপদ থেকে উঠে এসে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির উত্তাল স্রোতে নিজেকে একজন ধৈর্যশীল, সংযত ও সংগ্রামী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্রজীবনেই যুক্ত হন রাজনীতির সঙ্গে। ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার রাজনৈতিক পথচলা।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ—বাঙালির ইতিহাসের দুই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের উত্তাল সময় প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। সেই সময়ের রাজনৈতিক চেতনা, বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাই পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক দর্শনের ভিত গড়ে দেয়।

শিক্ষাজীবন শেষে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে ঢাকা কলেজে শুরু হয় তার কর্মজীবন। কিন্তু, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তাকে বেশিদিন পেশাগত জীবনের গণ্ডিতে আটকে রাখতে পারেনি।

১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন তিনি। জনসম্পৃক্ত রাজনীতিতে ফিরে এসে ১৯৮৮ সালে নির্বাচিত হন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং নিজের ব্যক্তিত্ব—দুইয়ের সমন্বয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে তিনি তৈরি করেন শক্ত অবস্থান।

এরপর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি সরাসরি যোগ দেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপিতে। শুরু হয় তার জাতীয় রাজনীতির নতুন অধ্যায়। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয় তাকে।

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সেই সরকারের সময়ে কৃষি এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন তিনি; পরে দায়িত্ব পান বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে।

সরকারে থাকাকালীন তার পরিচয় ছিল নীতি নির্ধারণে মনোযোগী একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে। কিন্তু, তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় এসে উপস্থিত হয় ওয়ান ইলেভেনের সময়ে। ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও কঠিন।

২০০৯ সালের পর শুরু হয় মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন এবং দীর্ঘ সংগ্রামের সময়। বিএনপির কাউন্সিলে তারেক রহমানের ছেড়ে দেওয়া সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন তিনি। এরপর একদিকে তৎকালীন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাস জীবন, অন্যদিকে দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস—দুই কঠিন বাস্তবতার মাঝখানে রাজপথে বিএনপির নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন মির্জা ফখরুল।

রাজপথের আন্দোলন, রাজনৈতিক কর্মসূচি, গ্রেপ্তার, মামলা—একটির পর একটি প্রতিকূলতা এসেছে তার সামনে। কখনো কারাগারে, কখনো আদালতের বারান্দায়, কখনো রাজপথে—দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপিকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন তিনি।

প্রতিদানস্বরূপ ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। এর আগে ৫ বছর পালন করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব। দীর্ঘ এ পথচলায় বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার কঠিন দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বিএনপির সাংগঠনিক সংকট, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা কিংবা রাজপথের কঠিন মুহূর্ত—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাকে দেখা গেছে দলের নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে।

রাজনীতির রুক্ষ বাস্তবতার বাইরেও মির্জা ফখরুল একজন সংবেদনশীল মানুষ। অর্থনীতি ও সাহিত্যের প্রতি তার গভীর অনুরাগ রয়েছে। তার ব্যক্তিত্বে যেমন রয়েছে রাজনৈতিক দৃঢ়তা, তেমনি রয়েছে মানবিকতার কোমল স্পর্শ। আর এ কারণেই রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের অনেকের কাছেও তিনি পেয়েছেন ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা ও সম্মান।

ঠাকুরগাঁওয়ের একজন শিক্ষক থেকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান নেতৃত্ব—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই যাত্রা তাই কেবল একটি রাজনৈতিক জীবনের গল্প নয়। এটি এক ধৈর্যের গল্প; ত্যাগের গল্প। তার এই যাত্রা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সোজা দাঁড়িয়ে থাকার গল্প; দীর্ঘ রাজনৈতিক পরীক্ষার মধ্যেও আস্থা ধরে রাখার গল্প।

এসটিআর

এক নজরে মির্জা ফখরুলের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন
লোগো
Aug 14, 2026

এক নজরে মির্জা ফখরুলের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

লোগো
বিস্তারিত কমেন্টে
shadhindiganta.com
/ Shadhin Diganta