টিকাদানকেন্দ্র ভাঙচুরে এমপি-পুলিশ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
রাজধানীর মিরপুর-১-এর বেসরকারি সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সংরক্ষিত সংসদ সদস্য (এমপি) ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে ঘটনায় পুলিশের কোনো গাফিলতি থাকলে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার এসব কথা বলেন।
একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি এ ঘটনা ঘটিয়েছেন এবং ওই সময় পুলিশকে ব্যবহার করেছেন- এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘মামলা হয়েছে, আমরা মামলা তদন্ত করছি। তদন্তেই এই ঘটনায় যারাই জড়িত, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’
থানা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে কীভাবে লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটল এবং ট্রাকে করে মালামাল নিয়ে যাওয়া হলো- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের একটি জনাকীর্ণ জায়গায় এত বেশি ধ্বংসযজ্ঞ নিশ্চয়ই দীর্ঘ সময় ধরে করা হয়েছে। আমি আজ পরিদর্শন করে যা দেখলাম, তাতে আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টায় করা সম্ভব নয়। সময় নিয়েই এটা করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশেষ করে দুই পাশে টিনের শেড আছে, সেগুলোও বিনষ্ট ও ভাঙা হয়েছে। বিল্ডিংয়ের বিভিন্ন জায়গায় আলামত দেখতে পেয়েছি। এ ছাড়া বিল্ডিংয়ের ভেতরে ল্যাব ইকুইপমেন্টের অনেক যন্ত্রপাতি পাওয়া যাচ্ছে না। যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে।’
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘ঘটনাটি আমাদের নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে মিরপুরের ডিসিকে নির্দেশনা দিয়েছি এবং মামলা রেকর্ড হয়েছে। চারজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছি। পুলিশের পক্ষ থেকে যে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার, আমরা তা নিচ্ছি। অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্যও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এজাহারে একজনের নাম উল্লেখ করে আরও ২০০ থেকে ২৫০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে নাম উল্লেখ থাকা ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের জন্য আমরা চেষ্টা করছি। আশা করছি, খুব দ্রুত তাকে গ্রেপ্তার করতে পারব। পাশাপাশি ঘটনায় জড়িত অন্যদের মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের অভিযান চলছে।’
ঘটনার সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার পরও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায় পুলিশও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা অবশ্যই পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমরা দেখছি, এ ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো অবহেলা ছিল কি না। পুলিশ জানার পর সময়মতো ঘটনাস্থলে এসেছিল কি না এবং পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো গাফিলতি ছিল কি না- সবকিছুই দেখা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় এরই মধ্যে অতিরিক্ত উপকমিশনারকে (এডিসি) প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত কমিটির আজকের (শনিবার) মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পুলিশের কোনো সদস্যের অবহেলা বা গাফিলতি পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘আমরা কোনো দল দেখব না, কোনো মত দেখব না। সব সময় অপরাধীকে দেখব। অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসব। আমরা সব সময় একটি বিষয়ে সজাগ- যেকোনো ধরনের বেআইনি কার্যক্রম, দখল বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড কেউই করতে পারবে না। যে-ই করবে, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা উচিত। অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না।’
গত বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ১২টার দিকে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবন ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে সেখানে দোকানদার সমিতির একটি সাইনবোর্ডও টাঙিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় মামলা করা হয়েছে।
শুক্রবার সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার জানান, প্রায় ২৫০ জনের মুখোশ পরা একটি দল ‘সম্মাননা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর ব্যানারে ক্লিনিকে হামলা চালায়। তারা কর্তব্যরত দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে ভেতরে প্রবেশ করে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। পরে ক্লিনিকের দখল নিয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষকে সেখানে প্রবেশে বাধা দেয়।
ডা. নাসরিনের দাবি, হামলাকারীরা সরকারি ইপিআই টিকা, টিকা দেওয়ার রেজিস্টার ও বিভিন্ন নথি, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন সরঞ্জাম ও পদ্ধতি, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, নগদ প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন নিয়ে গেছে।
এ ছাড়া একটি জেনারেটর, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি এসি, সিসিটিভি ক্যামেরা, তিনটি স্টিলের আলমারি, পাঁচটি স্টিলের ফাইল কেবিনেট, ল্যাবরেটরির সরঞ্জাম ও রিএজেন্ট, দুটি টিভি, দুটি কম্পিউটার, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার এবং বিভিন্ন আসবাবপত্র লুট করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, হামলাকারীরা ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ কেন্দ্রটির স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। পরে সেখানে ‘সম্মাননা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’-এর একটি সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেওয়া হয়।
ডা. নাসরিন বলেন, শুধু যন্ত্রপাতি ও মালামালের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণই আনুমানিক দেড় কোটি টাকা। রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রায় ৫০ বছর ধরে মিরপুর এলাকার দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও শিশুদের টিকাদান সেবা দিয়ে আসছে।
তিনি বলেন, পরদিন থেকে সরকারি হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার কথা ছিল। কেন্দ্রটি দখল ও ভাঙচুরের কারণে হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
ঘটনার পর কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলেও জানান প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, ‘এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা নয়, দেশের দরিদ্র, শিশু ও অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের ওপরও আঘাত।’
ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত বিচার ও শাস্তির দাবি জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রটির সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিয়ে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালুর দাবিও জানানো হয়েছে।
শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মামলায় হানিফ মিয়ার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে অনধিকার প্রবেশ, চুরি, হুমকি এবং দেড় কোটি টাকার বেশি ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
-স্বাধীন/এমএ
টিকাদানকেন্দ্র ভাঙচুরে এমপি-পুলিশ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার

