ফ্যামিলি কার্ড পাবেন না ৮ শ্রেণির মানুষ, নীতিমালা জারি
দরিদ্র, অতি দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনতে ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার।
নতুন এই নীতিমালায় ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে আট ধরনের ব্যক্তি বা পরিবারকে অযোগ্য হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
সম্প্রতি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় নীতিমালাটি জারি করে। এর মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো নির্ধারণ করা হলো।
নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারের ঘোষিত ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বৈষম্যহীন ও মানবিক ‘সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার রয়েছে। এর অন্যতম মূল দর্শন হলো—‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’।
এই দর্শনের ভিত্তিতে দেশের অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে সমন্বিত ডিজিটাল সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
কর্মসূচিটির আওতায় প্রায় ২ কোটি নারী পরিবার প্রধানকে সরাসরি জিটুপি পদ্ধতিতে প্রতি মাসে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যেসব ৮ শ্রেণির মানুষ ফ্যামিলি কার্ড পাবেন না
নীতিমালায় ফ্যামিলি কার্ডের নগদ সহায়তার ক্ষেত্রে একটি ‘নেগেটিভ লিস্ট’ বা বহির্ভূত তালিকা রাখা হয়েছে। নিচের বৈশিষ্ট্যগুলোর যেকোনো একটি থাকলে ব্যক্তি বা পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য অযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
১. সরকার নির্ধারিত পিএমটি স্কোরের ঊর্ধ্বসীমার চেয়ে বেশি স্কোর পাওয়া পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পাবে না।
২. পরিবারের মনোনীত নারী প্রধান সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে নিয়মিত বেতন-ভাতা পেলে তিনি এ সুবিধার আওতায় থাকবেন না। এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা কর্মচারীরাও ফ্যামিলি কার্ডের জন্য বিবেচিত হবেন না।
৩. মনোনীত নারী প্রধান নিয়মিত সরকারি পেনশন বা একই ধরনের অবসর সুবিধা পেলে ফ্যামিলি কার্ড পাবেন না। তবে প্রতিবন্ধী সন্তান হিসেবে বিশেষ পেনশন সুবিধা গ্রহণকারী এ শর্তের বাইরে থাকবেন।
৪. পরিবারের কোনো সদস্যের নামে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকলে পরিবারটি ফ্যামিলি কার্ড পাবে না। একইভাবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়, ফিক্সড ডিপোজিট বা অন্য কোনো বিনিয়োগ থাকলেও সুবিধা মিলবে না।
এক পরিবারে এক ওয়ান-আইডি
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় তালিকাভুক্ত প্রতিটি যোগ্য পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী ও অনন্য পরিচিতি নম্বর দেওয়া হবে। ‘ওয়ান-আইডি’ নামে এ পরিচিতি ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট পরিবারের কেন্দ্রীয় পরিচিতি হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, ওয়ান-আইডি শুধু একটি পরিচিতি নম্বর নয়। এটি রাষ্ট্রীয় তথ্য ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত ও সুসংহত ডেটা গভর্ন্যান্স কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে জাতীয় স্বার্থে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এ তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
একাধিক সরকারি সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নেই
ফ্যামিলি কার্ডধারী মনোনীত নারী পরিবার প্রধান একই সময়ে অন্য কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সমজাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অধীনে আর্থিক, খাদ্য বা অন্য কোনো সুবিধা নিতে পারবেন না।
কোনো নারী প্রধান আগে থেকেই টিসিবির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট বা ভিডব্লিউবি কর্মসূচির সুবিধা পেয়ে থাকলে তার আগের সুবিধা কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ যাচাইয়ের মাধ্যমে বাতিল বা স্থগিত করা হবে।
একইভাবে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা বা সমজাতীয় সরকারি নগদ সহায়তা গ্রহণকারী নারী প্রধান ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা নেওয়ার সময় আগের সুবিধা রাখতে পারবেন না।
তবে মনোনীত নারী প্রধান ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যরা প্রচলিত নিয়মে অন্যান্য সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।
ফ্যামিলি কার্ডের আবেদনকারীর তথ্যের সত্যতা ও সঠিকতা যাচাই করতে বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডেটাবেজের সঙ্গে এপিআই সংযোগ স্থাপন করা হবে।
জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিআরটিএ, ভূমি মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগের আওতাধীন সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি এমআইএস এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের সঙ্গে এ সংযোগ করা হবে।
কারিগরি প্রয়োজনে সরকার যেকোনো সময় এ তালিকার পরিধি বা এপিআই সংযোগ পুনর্বিন্যাস করতে পারবে।
জালিয়াতি ধরতে এআই
ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয়েছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রিতে সংরক্ষিত তথ্যে কোনো অসঙ্গতি বা জালিয়াতি প্রতিরোধে সরকার প্রয়োজনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা মেশিন লার্নিংভিত্তিক অসঙ্গতি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি যুক্ত করতে পারবে।
অর্থাৎ একজন আবেদনকারীর আয়, সঞ্চয়, জমি, যানবাহন, কর প্রদান বা অন্য কোনো সরকারি সুবিধা গ্রহণের তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে তা প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
ফ্যামিলি কার্ড চালু করা ছিল বর্তমান বিএনপি সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। সরকার গঠনের পর প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে এ কর্মসূচি চালু করা হয়। পাইলট পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য পৃথক গাইডলাইনও করা হয়েছিল।
পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবার দেশের বড় পরিসরে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালায় একদিকে প্রায় ২ কোটি নারী পরিবার প্রধানকে জিটুপি পদ্ধতিতে নগদ সহায়তার আওতায় আনার লক্ষ্য রাখা হয়েছে, অন্যদিকে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার নির্বাচন, একই ব্যক্তির একাধিক সরকারি সুবিধা গ্রহণ বন্ধ, সম্পদ ও আয় যাচাই এবং তথ্যের অসঙ্গতি শনাক্তের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
-স্বাধীন/এমএ
ফ্যামিলি কার্ড পাবেন না ৮ শ্রেণির মানুষ, নীতিমালা জারি

