শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে মা-বাবার সুরক্ষার আইন ঠেকানো যাবে না: চিফ হুইপ

প্রকাশঃ Sep 11, 2026 - 15:40
শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে মা-বাবার সুরক্ষার আইন ঠেকানো যাবে না: চিফ হুইপ

মা-বাবার সম্পত্তির অধিকার ও ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের বিরোধিতা করে শরিয়া আইনের দোহাই দেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।

তিনি বলেছেন, মা-বাবাকে সম্মান ও সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে। অথচ তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হলে এর বিরোধিতা করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন চিফ হুইপ।

তিনি বলেন, সরকার ‘শরিয়া আইন চালু হবে’—এমন কোনো কথা বলেনি। শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে যারা প্রস্তাবিত আইনের বিরোধিতা করছেন, তাদের নিজেদের অবস্থানও পরিষ্কার করা উচিত।

দেশের বিভিন্ন স্থানে মা-বাবার অবহেলা ও নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, অনেক মা-বাবা বৃদ্ধাশ্রমে থাকছেন। কেউ কেউ অসুস্থ মা-বাবাকে ঘরে আটকে রাখছেন, তাদের সম্পত্তি নেওয়ার চেষ্টা করছেন কিংবা খোঁজখবরও রাখছেন না। জীবনের শেষ সময়ে মা-বাবার নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করতেই এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এই আইন করে তারেক রহমানের কী লাভ হবে? এখানে ব্যক্তিগতভাবে কারও কী লাভ হবে? দেশের সাধারণ মানুষের মা-বাবাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই তো এই উদ্যোগ।’

শরিয়া আইনের প্রসঙ্গ টেনে চিফ হুইপ বলেন, বাংলাদেশে ফৌজদারি আইনসহ বিভিন্ন আইন প্রচলিত রয়েছে। শরিয়া আইনে চুরির শাস্তি হিসেবে হাত কাটার বিধান থাকলেও বাংলাদেশে তা প্রয়োগ করা হয় না। তাহলে প্রচলিত আইনের অধীনে যারা আইন পেশায় যুক্ত, তারা কেন শরিয়া আইনের প্রসঙ্গ তুলে জনকল্যাণমূলক একটি আইনের বিরোধিতা করবেন?

আইন প্রণয়নে মতামত নেওয়া হয়েছে

সংসদে পাস হওয়া বিভিন্ন আইন প্রসঙ্গে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিয়েছে। মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, বিচারক ও সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনগুলো আরও কার্যকর করার চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, মানবাধিকার যাতে কোনোভাবেই লঙ্ঘিত না হয়, সেভাবেই আইন প্রণয়নের চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ ও সার সংকট নিয়েও বক্তব্য

দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকট নিয়েও কথা বলেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে কয়েক বছর সময় লাগে। ফলে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করতে হবে।

সারের সংকট প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন অতিরিক্ত সার রয়েছে। তবে বিতরণ ব্যবস্থায় নানা সমস্যার কারণে সংকট তৈরি হয়েছে। আগের সরকারের সময়ের প্রায় চার হাজার সার ডিলার এবং বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়মকেও এর জন্য দায়ী করেন তিনি।

কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও হেলথ কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা চলছে।

বিদ্যুৎ খাতে বিগত সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে চিফ হুইপ বলেন, প্রয়োজন না থাকলেও অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। বর্তমান সরকার এসব ব্যয় কমিয়ে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, কোনো দেশকে শত্রু হিসেবে দেখার নীতি সরকারের নেই। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় সরকার।

তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ। দেশের স্বার্থ রক্ষা করে যে কাজ করা প্রয়োজন, আমরা সেটিই আগে করব।’

ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণের বিষয়েও কথা বলেন চিফ হুইপ। তার দাবি, বাংলাদেশকে ব্রিকসের চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেছিল, তাদের সেই সম্মান দেওয়া হবে। সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় সরকার।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের কথা

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, সরকারের অবস্থান স্পষ্ট। সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হলে সংসদের মাধ্যমেই তা করা হবে।

তিনি বলেন, বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে চায় সরকার। ‘আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করব। এর জন্য যেখানে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে, সেখানে সংবিধান সংশোধন করেই তা করা হবে,’ বলেন তিনি।

সরকার দেশে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে বলেও দাবি করেন চিফ হুইপ। এ কাজে বিরোধী দলসহ সবার সহযোগিতা চান তিনি।

এমওইউ পর্যালোচনা করছে সরকার

সরকারের বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) পর্যালোচনা করে দেশের স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান নুরুল ইসলাম মনি।

তিনি বলেন, ১০১টি এমওইউ নিয়েই আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন মনে হলে কোনো কোনো চুক্তি বাতিলও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মতপার্থক্য বাড়ছে—এমন দাবি নাকচ করে চিফ হুইপ বলেন, বরং দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। তবে বিরোধী দলের নেতার বক্তব্যে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ‘ন্যারেটিভ’ তৈরির চেষ্টা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের বিরোধিতা না করে জনস্বার্থে গঠনমূলক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে চিফ হুইপ বলেন, সরকার দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে এগিয়ে যেতে চায়।


-স্বাধীন দিগাস্ত/এস

শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে মা-বাবার সুরক্ষার আইন ঠেকানো যাবে না: চিফ হুইপ
লোগো
Sep 11, 2026

শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে মা-বাবার সুরক্ষার আইন ঠেকানো যাবে না: চিফ হুইপ

লোগো
বিস্তারিত কমেন্টে
shadhindiganta.com
/ Shadhin Diganta