সাহায্য নয়, ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ চায় নেপাল
ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জলবায়ুজনিত ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে নেপাল। দেশটির দাবি, বিশ্বের শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক দায় রয়েছে।
গত ২৬ আগস্ট ভোতেকোশি নদীর অববাহিকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। উচ্চ পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ বরফ, পানি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নেপালের অন্তত তিনটি জেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত করে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত এক হাজার ১০০টির বেশি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মানুষ।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, এমন দুর্যোগের পর বিষয়টিকে কেবল ‘ত্রাণ’ বা ‘সহায়তা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এর সঙ্গে ‘নৈতিক দায়’ ও ‘ক্ষতিপূরণ’-এর বিষয়টি যুক্ত রয়েছে।
কান্তিপুর টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জলবায়ু ইস্যুতে নেপাল তার কূটনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন আনছে। এখন শুধু ‘সহায়তা’ নয়, বরং ‘ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ’-এর দাবি সামনে আনা হচ্ছে।
খানাল বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নে নেপালের অবদান খুবই সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাবগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে দেশটি। দ্রুত হিমবাহ গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি অঞ্চলে একের পর এক ভয়াবহ দুর্যোগ এরই উদাহরণ।
তিনি বলেন, চীন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশ। এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। নেপালের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে এসব দেশের ঐতিহাসিক দায় রয়েছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায়, ‘এটি কোনো দাতব্য বিষয় নয়; এটি আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়।’
খানাল আরও জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পক্ষে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে নেপাল আরও জোরালোভাবে বিষয়টি তুলে ধরবে। বিশেষ করে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার কারণে ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার পানির নিরাপত্তা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তার দাবি, হিমালয়ের হিমবাহগুলো একসময় বিলীন হয়ে গেলে গঙ্গা ও ত্রিশূলীর মতো নদীর ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কোটির বেশি মানুষের পানির নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদে সংকটে পড়বে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণের দাবি
এদিকে নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।
গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যার পর ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় গঠিত তহবিলের বোর্ডের কাছেও জরুরি আর্থিক সহায়তা চেয়েছে নেপাল।
নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে ও বন ও কৃষিমন্ত্রী গীতা চৌধুরী যৌথভাবে পাঠানো চিঠিতে দ্রুত সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির পাশাপাশি ঘরবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এতটাই ব্যাপক যে তা মোকাবিলায় নেপালের নিজস্ব তাৎক্ষণিক সক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়।
জলবায়ু ন্যায্যতায় ভারতের অবস্থান
জলবায়ু ন্যায্যতার প্রশ্নে ভারতও দীর্ঘদিন ধরে উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়ের বিষয়টি তুলে ধরে আসছে। নয়াদিল্লির অবস্থান হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশগুলোর ঐতিহাসিক কার্বন নিঃসরণ, উন্নয়নের প্রয়োজন এবং সক্ষমতার পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
ভারত উন্নয়নশীল ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে সমর্থন করে। একই সঙ্গে দেশটির বক্তব্য, শিল্পায়নে এগিয়ে থাকা উন্নত দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে বৈশ্বিক কার্বন বাজেটের বড় অংশ ব্যবহার করেছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করার দায়িত্বও তাদের রয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
-স্বাধীন/এমএ
সাহায্য নয়, ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ চায় নেপাল

