নেপালে হঠাৎ ভয়াবহ দুর্যোগ, কেন এমন হলো? যা বলছেন বিজ্ঞানীরা
নেপালে হঠাৎ আঘাত হানা ভয়াবহ এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ১৬০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ১,৫০০ জন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮০০ জন বিদেশি নাগরিক। সীমান্তের চীনা অংশে থাকা নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, কয়েক তলা উঁচু একটি ভবনের ওপর মুহূর্তের মধ্যে কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল ঢল আছড়ে পড়ে। প্রবল স্রোতে বাস ও গাড়িগুলোও খেলনার মতো ভেসে যায়।
এএফপির বরাতে ফ্রান্স ২৪ জানিয়েছে, এই দুর্যোগের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে ‘পৃথিবীর ছাদ’ নামে পরিচিত হিমালয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বরফ, হিমবাহ ও পানির ব্যবস্থায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা গেছে। এসব পরিবর্তনের কারণে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধস হয়ে থাকতে পারে। সেই ভূমিধসে একটি নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে গিয়ে প্রাকৃতিক বাঁধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে সেই বাধা ভেঙে জমে থাকা পানি ও ধ্বংসাবশেষ প্রবল গতিতে নিচের দিকে নেমে আসে। তবে পরে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, সেখানে যে কম্পন অনুভূত হয়েছিল, সেটি মূলত হিমবাহ ধসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এর আগে সংস্থাটির প্রাথমিক তথ্যে ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধসের কথা বলা হয়েছিল।
ঘটনার আগে ঘটনাস্থল ও আশপাশে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতও হয়নি। বিষয়টিকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটি সান আন্তোনিওর পানিবিদ হাতিম শরিফ। তাঁর মতে, এত দ্রুতগতির এই ধরনের দুর্যোগ প্রচলিত বন্যা সতর্কতা ব্যবস্থাকেও প্রায় অকার্যকর করে দিতে পারে।
হাতিম শরিফ আরও বলেন, কাদা ও পানির এই প্রবল স্রোত অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নেমে আসে। ফলে পরিস্থিতি বুঝে দৌড়ে পালানোর সুযোগ অনেক সময় থাকে না। গাড়িতে করে নিরাপদে সরে যাওয়ার চেষ্টাও বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ ধ্বংসাবশেষে ভরা কাদার স্রোত অনেকটা ‘তরল কংক্রিটের’ মতো আচরণ করতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত উঁচু জায়গায় উঠে যাওয়াই সবচেয়ে কার্যকর জীবনরক্ষাকারী পদক্ষেপগুলোর একটি। শরিফের মতে, সম্ভব হলে অন্তত ২০ ফুট বা প্রায় ৬ মিটার উঁচু জায়গায় সরে যাওয়া নিরাপদ। যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডরোথি হাইনরিখও মনে করেন, হিমালয়ের সংকীর্ণ নদী উপত্যকাগুলো এ ধরনের বিপদের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তুষারধস বা ভূমিধসের কারণে নদীর প্রবাহ আটকে গেলে সেখানে বিপুল পরিমাণ পানি জমতে পারে। পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গেলে আকস্মিক ও ভয়াবহ ঢল তৈরি হয়।
আরও একটি ঢলের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন আইসিআইএমওডির জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং। তাঁর মতে, উজানের কিছু এলাকায় এখনো নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। সে কারণে পরবর্তী সময়ে আবারও বড় ধরনের ঢল নামার ঝুঁকি রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা?
হিমবাহের হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যা বা জিএলওএফের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে নেপাল অন্যতম। কোনো হিমবাহের বরফ গলে বড় হ্রদ তৈরি হলে এবং কোনো কারণে সেই হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে।
এর আগেও নেপালের রসুয়া জেলায় এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের জুলাইয়ে চীনের গিয়িরং কাউন্টি থেকে নেমে আসা প্রবল ঢল রসুয়া এলাকায় আঘাত হানে। তবে এবারের দুর্যোগের পেছনে সরাসরি জিএলওএফ কাজ করেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
আগামী কয়েক দিন ও সপ্তাহে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা ঘটনাটি বিশ্লেষণ করবেন। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা জানতে করা হবে ‘অ্যাট্রিবিউশন স্টাডি’। এই গবেষণায় বর্তমান উষ্ণ জলবায়ুতে এ ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কতটা বেড়েছে, তা বিশ্লেষণ করা হবে। পাশাপাশি শিল্পবিপ্লবের আগের জলবায়ুর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনাও করা হবে।
অর্থাৎ, এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে জলবায়ু পরিবর্তনই নেপালের এবারের দুর্যোগের সরাসরি কারণ। তবে উষ্ণায়নের ফলে হিমালয়ের হিমবাহ ও হিমবাহ-সংলগ্ন হ্রদগুলোতে যে পরিবর্তন হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক বন্যা ও ধসের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে—এমন আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের মধ্যে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
-স্বাধীন/ এমএ
নেপালে হঠাৎ ভয়াবহ দুর্যোগ, কেন এমন হলো? যা বলছেন বিজ্ঞানীরা

