সালাহউদ্দিনের গুমের আগে কী ঘটেছিল? বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জোরপূর্বক গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও অন্যতম। সরকারবিরোধী আন্দোলনে দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালনকালে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ দুই মাস নিখোঁজ থাকার পর ১১ মে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে তার সন্ধান পাওয়া যায়। একজন জাতীয় নেতাকে এভাবে প্রকাশ্যে গুম করে সীমান্ত পার করে দেওয়ার ঘটনায় তখন পুরো জাতি হতবাক হয়ে পড়েছিল।
আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিবসটিকে সামনে রেখে দেশের সবচেয়ে আলোচিত গুমের ঘটনাগুলোর একটি আবারও আলোচনায় এসেছে। অনেকেরই আগ্রহ—ঠিক কীভাবে, কোন পরিস্থিতিতে এবং কোথা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম করা হয়েছিল?
সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে ফেরার পর থেকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকায় ওই ঘটনার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ্যে তুলে ধরেননি। তবে ঢাকার উত্তরায় যে ফ্ল্যাট থেকে তাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল, সেই ফ্ল্যাটের মালিকের কাছ থেকে জানা গেছে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য। তিনি ওই সময়ের ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন বিস্তারিতভাবে।
২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর আগে ৩ জানুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ আয়োজনকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিএনপি মুখোমুখি অবস্থানে যায়। বিকল্প কর্মসূচি হিসেবে আওয়ামী লীগ রাজধানীর ১৬টি স্থানে অবস্থান কর্মসূচি এবং বিএনপি নয়াপল্টনে সমাবেশের প্রস্তুতি নেয়।
বিএনপির নেতাকর্মীরা যাতে ঢাকায় প্রবেশ করে কর্মসূচিতে অংশ নিতে না পারেন, সে জন্য রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়ি বাড়ানো হয়। একই সময়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ওপর নজরদারি জোরদার করে। ৪ জানুয়ারি গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান নেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এর মধ্যেই দলের একের পর এক সিনিয়র নেতাকে গ্রেফতার করা হচ্ছিল।
এদিকে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নিয়মিত বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছিলেন দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। কয়েক দিনের মধ্যেই তাকেও গ্রেফতার করে পুলিশ। এমন পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তখনই যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদকে দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দলের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময়ই সালাহউদ্দিন আহমদকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর তিনি নিখোঁজ থাকেন। ৬২ দিন পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে তার সন্ধান মেলে।
গুম হওয়ার আগে তিনি কোথায় এবং কীভাবে ছিলেন—সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও সালাহউদ্দিন আহমদের ঘনিষ্ঠজন সৈয়দ হাবিব হাসনাত। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ভেল্লাপাড়ার মিয়াবাড়ির বাসিন্দা হাসনাত তখন একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সৈয়দ হাবিব হাসনাত বলেন, ‘সালাহউদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে আগে থেকেই আমার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারের বিভিন্ন এজেন্সি, গোয়েন্দা সংস্থা এবং র্যাব-পুলিশ তাকে গ্রেফতারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি শুরু করে। সন্দেহজনক সব স্থানে তাকে খুঁজতে থাকে তারা।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ অবস্থায় সালাহউদ্দিন ভাই গুলশানের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে নানা কৌশলে অবস্থান পরিবর্তন করে দলের দায়িত্ব পালন করছিলেন। একপর্যায়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার গুলশানে অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যায়। তবে তিনি ঠিক কোন বাড়ি বা কোন ফ্ল্যাটে আছেন, সেটি তারা তখনও জানতে পারেনি। কিন্তু তার অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর যেকোনো সময় তাকে আটক করা হতে পারে—এমন পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছিল।’
হাসনাতের ভাষ্য অনুযায়ী, গুলশান এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার পর দলের পরামর্শে সালাহউদ্দিন আহমদ দ্রুত স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় হাসনাত একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করতেন এবং গুলশানে সালাহউদ্দিন যে এলাকায় অবস্থান করছিলেন, তার কাছাকাছিই তার অফিস ছিল।
তিনি বলেন, ‘দল ও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বিকল্প কয়েকটি জায়গার কথা বলা হলে সালাহউদ্দিন ভাই আমার উত্তরার ফ্ল্যাটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফেব্রুয়ারি মাসের সম্ভবত শেষ দিন। দুপুরে লাঞ্চে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, এমন সময় সালাহউদ্দিন ভাই ফোন করেন। তিনি জানান, দ্রুত গুলশান ছাড়তে হবে এবং আমার উত্তরার ফ্ল্যাটে উঠতে চান। আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে বলি, কোনো সমস্যা নেই, আমিই আপনাকে নিয়ে যাব। সন্ধ্যার পর আসব, প্রস্তুত থাকবেন।’
হাসনাত বলেন, ‘কথা অনুযায়ী বিকেল ৫টার দিকে গাড়ি নিয়ে বের হই। গুলশানে তিনি যে বাড়িতে ছিলেন, সেটির অবস্থান খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া আর কেউ জানত না। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, সালাহউদ্দিন ভাইয়ের স্ত্রী এবং দলের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ নেতা বিষয়টি জানতেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাড়িটির কিছুটা দূরে গিয়ে আমি গাড়ির চালককে বলি, পাশে একটি মিষ্টির দোকান আছে, তুমি সেখানে গিয়ে মিষ্টি খাও। কারণ, তাকে বিষয়টি বুঝতে দেওয়া যাবে না। এরপর আমি নিজেই গাড়ি চালিয়ে বাড়িটির নিচে যাই এবং সালাহউদ্দিন ভাইকে ফোন করি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি নিচে নেমে আসেন। তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপি নেতা তাবিথ আউয়াল।’
‘তাদের দুজনকে গাড়ির পেছনের সিটে বসিয়ে উত্তরার দিকে রওনা দিই। পথে এমন রুট ব্যবহার করি, যেসব এলাকায় পুলিশের চেকপোস্ট ছিল না। সন্ধ্যার কিছু পর তাদের নিয়ে উত্তরার ফ্ল্যাটে পৌঁছাই।’
উত্তরার ফ্ল্যাটে পৌঁছানোর পরও সতর্কতা অবলম্বন করা হয় বলে জানান হাসনাত। তিনি বলেন, ‘দারোয়ানদের বিষয়টি জানতে দেওয়া যাবে না। তাই দায়িত্বে থাকা দারোয়ানকে ডেকে বলি, আমি ওপরে যাচ্ছি, আমার জন্য দুই প্যাকেট সিগারেট নিয়ে এসো। আমি গেটেই দাঁড়িয়ে আছি।’
‘দারোয়ান বাইরে যেতেই আমি গাড়ির দরজা খুলে দিই। সালাহউদ্দিন ভাই ও তাবিথ আউয়াল গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত ফ্ল্যাটে উঠে যান। আমি তাদের নির্দিষ্ট তলায় নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটে যেতে বলি। সেখানে একজন বাবুর্চি ও একজন সহকারীকে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। তাদের বলে দেওয়া হয়—মেহমান এখানে থাকবেন, তার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সেবা ও দেখাশোনা করতে হবে।’
হাসনাত জানান, পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করে তিনি সেখান থেকে বের হয়ে স্ত্রীকে নিয়ে অন্য একটি ফ্ল্যাটে গিয়ে ওঠেন। এরপর উত্তরার ওই ফ্ল্যাট থেকেই সালাহউদ্দিন আহমদ দলের নির্দেশনা অনুযায়ী আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন বিবৃতি ও ভিডিও বার্তা পাঠাতে থাকেন।
এভাবেই একদিকে আন্দোলন চলছিল, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে খুঁজছিল। সেই পরিস্থিতির মধ্যেই কেটে যাচ্ছিল দিন। পরে ১০ মার্চ ঢাকার উত্তরার ওই ফ্ল্যাট থেকেই নিখোঁজ হন সালাহউদ্দিন আহমদ। দীর্ঘ ৬২ দিন পর তার সন্ধান মেলে ভারতের শিলংয়ে।
-স্বাধীন/এমএ
সালাহউদ্দিনের গুমের আগে কী ঘটেছিল? বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

