বাড়তে থাকা উষ্ণতায় কঠিন হয়ে উঠছে মানুষের টিকে থাকার বাস্তবতা

প্রকাশঃ Jul 20, 2026 - 18:20
বাড়তে থাকা উষ্ণতায় কঠিন হয়ে উঠছে মানুষের টিকে থাকার বাস্তবতা

জয়নাল আবেদীন : বিশ্বজুড়ে ক্রমাগত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত আবহাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী খরা, ভয়াবহ বন্যা, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ঘটনাগুলো মানুষের জীবনযাত্রাকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর শুধু ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর দৃশ্যমান চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবী উষ্ণ হয়ে উঠলেও মানুষের বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে-এমন নয়। তবে বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে অনেক অঞ্চলে জীবনযাত্রা, জীবিকা এবং উন্নয়ন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জলবায়ু বিজ্ঞানী ডক্টর মাহবুবুর রহমান বলেন, “বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মানুষের জন্য বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি শুধু গরম বাড়ার বিষয় নয়; এটি কৃষি, পানি, স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলছে।” তাঁর মতে, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু অভিযোজন একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডক্টর নাজমা সুলতানা বলেন, “দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কারণে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং বাইরে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।” তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও সক্ষম করে তুলতে হবে।
রাজশাহীর কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, “আগে আবহাওয়ার একটা নিয়ম ছিল। এখন কখন বৃষ্টি হবে, কখন খরা হবে, তা বোঝা কঠিন। ফলে প্রতি মৌসুমেই নতুন করে দুশ্চিন্তা শুরু হয়।” খুলনার উপকূলীয় বাসিন্দা রওশন আরা বলেন, “লবণাক্ততা, ঝড় আর গরম-সব মিলিয়ে জীবন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন মনে হয়।”
কৃষি অর্থনীতিবিদ ডক্টর ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, “অনিয়মিত আবহাওয়া এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে খাদ্য উৎপাদনে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে এবং নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।” তিনি মনে করেন, জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন।
পরিবেশবিদ ডক্টর রাশেদুল করিম বলেন, “বনভূমি ধ্বংস, নদী ও জলাভূমির অবক্ষয় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরও তীব্র করে তুলছে। প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।”
চট্টগ্রামের জেলে মো. নুরুল ইসলাম বলেন, “সমুদ্রের আবহাওয়া এখন অনেক বেশি অনিশ্চিত। মাছ ধরতে গিয়ে আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকি নিতে হয়।” ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের প্রজন্ম সরাসরি অনুভব করছে। তাই পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ডক্টর সায়মা রহমান বলেন, “পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, শক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে শহর ও গ্রামে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।”
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা, নগর সবুজায়ন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নদী ও বন সংরক্ষণ এবং জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং প্রযুক্তি বিনিময়ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশ নীতিবিদ ডক্টর মাহমুদা আক্তার বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই এখন আর শুধু পরিবেশগত ইস্যু নয়; এটি উন্নয়ন, অর্থনীতি এবং মানবিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। আজ নেওয়া সিদ্ধান্তই আগামী প্রজন্মের জীবনযাত্রা নির্ধারণ করবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা মানুষের জীবনকে নিঃসন্দেহে আরও জটিল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ করে তুলছে। তবে বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি, পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রসার এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ, সহনশীল এবং টেকসই পৃথিবী গড়ে তোলার সুযোগ এখনো রয়েছে।

বাড়তে থাকা উষ্ণতায় কঠিন হয়ে উঠছে মানুষের টিকে থাকার বাস্তবতা
লোগো
Jul 20, 2026

বাড়তে থাকা উষ্ণতায় কঠিন হয়ে উঠছে মানুষের টিকে থাকার বাস্তবতা

লোগো
বিস্তারিত কমেন্টে
shadhindiganta.com
/ Shadhin Diganta