ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধস থেকেই নেপালে ভয়াবহ বন্যা: ইউএসজিএস

প্রকাশঃ Aug 27, 2026 - 13:19
ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধস থেকেই নেপালে ভয়াবহ বন্যা: ইউএসজিএস

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার আগে যে কম্পন অনুভূত হয়েছিল, সেটি ভূমিকম্পের কারণে নয়। বরং হিমবাহ ধস, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত থেকেই ওই কম্পনের সৃষ্টি হয়েছিল বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)।

বুধবার সকালে স্থানীয় সময় ৮টা ৩৭ মিনিটে ইউএসজিএস প্রথমে কাঠমান্ডুর উত্তরে নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প শনাক্ত হওয়ার কথা জানায়। পরে সংস্থাটি তাদের তথ্য সংশোধন করে জানায়, সেখানে কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি। বরং হিমবাহ ও পাথরের বড় ধরনের ধসের সঙ্গে ধ্বংসাবশেষের স্রোত নেমে আসার সময় যে কম্পন তৈরি হয়, সেটিই যন্ত্রে ভূমিকম্প হিসেবে ধরা পড়েছিল।

ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় নদীর নিম্নাঞ্চলে ব্যাপক বিপর্যয় তৈরি হয়। প্ল্যানেট ল্যাবসের উপগ্রহচিত্রের প্রাথমিক বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, বরফ ও পাথরের বিশাল ধসের ফলে লহেন্দে নদীতে হঠাৎ করে কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নেমে আসে। ঘটনাস্থলটি নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়াগাড়ি সীমান্ত চৌকি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে।

লহেন্দে নদী ভোতে কোশি নদীর একটি শাখা, যা চীনের তিব্বত অঞ্চল থেকে নেপালে প্রবাহিত হয়েছে। হিমবাহ ও পাথর ধসে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নদীতে নেমে আসার পর ভোতে কোশিতেও আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়।

এই দুর্যোগে নেপালে ১৫৭ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নেপাল পুলিশ এখন পর্যন্ত ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, ভয়াবহ ওই ধসের শক্তি পরে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ছিল।

বন্যার পর রাসুওয়া, ধাদিং ও নুওয়াকোটসহ বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজও চলছে। তবে দুর্যোগের কয়েক ঘণ্টা পরও বহু মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অন্তত ৪০৩ জন পর্যটকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপাল পর্যটন বোর্ড।

স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ পানির ঢল নামে। তিব্বতের দিক থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ পানি নদীটির বিভিন্ন অংশ প্লাবিত করে। নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুওয়া ও ধাদিং জেলা এবং নুওয়াকোটের বেশ কিছু এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পানির সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত নেমে আসায় বহু বাড়িঘর, গাছপালা ও যানবাহন পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক স্থাপনা ও যানবাহন কাদার নিচেও চাপা পড়ে।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের তিব্বত অংশের নিরাপত্তা ক্যামেরার ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রবল স্রোত নেমে আসার আগে স্থানীয় অনেক মানুষ দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর পানির সঙ্গে আসা পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত ভবন ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে তিব্বতের গিরং এলাকাতেও। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, সেখানে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে নিহতের সংখ্যা এখনও যাচাই করা হচ্ছে। সীমান্তের ওই অংশেও উদ্ধার তৎপরতা চলছে।

পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের কারণে সীমান্তের দুই পাশেই যোগাযোগব্যবস্থা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। নুওয়াকোট ও ধাদিংয়ের অনেক বাসিন্দা নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে নেপালি সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের বাইরে জড়ো হয়েছেন। উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার পরিচালনার জন্য কেন্দ্রটিকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

নিখোঁজদের তথ্য সংগ্রহে সেখানে পুলিশ তালিকা তৈরি করছে। বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে পুলিশ সদস্যদের মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইটের আলো ব্যবহার করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের নাম ও তথ্য সংগ্রহ করতে দেখা গেছে।

এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আটকে পড়া জীবিতদের দ্রুত উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়া মরদেহ উদ্ধারের কাজও চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে হেলিকপ্টারের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সরকারের সব ধরনের সম্পদ কাজে লাগানো হবে। দুর্যোগের পর দেশটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিখোঁজ মানুষদের দ্রুত খুঁজে বের করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে প্রয়োজনীয় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া।


-স্বাধীন/ এমএ

ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধস থেকেই নেপালে ভয়াবহ বন্যা: ইউএসজিএস
লোগো
Aug 27, 2026

ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধস থেকেই নেপালে ভয়াবহ বন্যা: ইউএসজিএস

লোগো
বিস্তারিত কমেন্টে
shadhindiganta.com
/ Shadhin Diganta