নেপালের ভয়াবহ বন্যা
স্কুল ভেসে গেছে, গাছে উঠে প্রাণে বাঁচল ৮ বছরের জোয়াল
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের সময় জঙ্গলে পালিয়ে গাছে উঠে প্রাণে বেঁচে যাওয়া আট বছর বয়সী জোয়াল ঘালে অবশেষে তার মায়ের দেখা পেয়েছে।
শুক্রবার কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে ছেলের কাছে পৌঁছান মা মাত্তি মায়া তামাং। বন্যার পর টানা একদিন দুই সন্তানকে খুঁজে বেড়িয়েও কোনো সন্ধান না পেয়ে তিনি ধরে নিয়েছিলেন, স্কুলে থাকা দুই ছেলেই হয়তো মারা গেছে।
জোয়ালকে উদ্ধারের সময় তার হাতে ছিল ১০ রুপির দুটি নোট। ওই ২০ রুপিই পরে তাকে হাসপাতালে যেতে রাজি করানোর ক্ষেত্রে কাজে লাগে।
স্কুল থেকে জঙ্গলে, এরপর গাছে আশ্রয়
বুধবার নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের সময় স্কুলে ছিল জোয়াল। হঠাৎ বন্যার পানি ও ধ্বংসাবশেষ দ্রুত এগিয়ে এলে এক বন্ধুর সঙ্গে স্কুল থেকে দৌড়ে জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যায় সে। পরে একটি গাছে উঠে নিরাপদ আশ্রয় নেয়।
পরদিন ভাঙা পা ও মুখে আঘাত নিয়ে হেলিকপ্টারে তাকে পাশের নুয়াকোট জেলার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা চললেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার পরিবারের কোনো সন্ধান পাচ্ছিল না।
অন্যদিকে দুই সন্তানের খোঁজে এক আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অন্য আশ্রয়কেন্দ্রে এবং বিভিন্ন তালিকা সংগ্রহের কেন্দ্রে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন তামাং। কোথাও সন্তানদের নাম না পেয়ে একসময় তিনি ধরে নেন, তারা আর বেঁচে নেই।
তামাং বলেন, চতুর্থ জায়গাতেও সন্তানদের নাম তালিকায় ছিল না এবং সেখানেও তাদের পাওয়া যায়নি। তিনি ধরে নিয়েছিলেন, তার দুই সন্তানই মারা গেছে। ওই সময় তিনি শুধু কাঁদছিলেন এবং নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না।
রয়টার্সের সাংবাদিকের মাধ্যমে মিলল ছেলের সন্ধান
বৃহস্পতিবার তামাং জানতে পারেন, তার বড় ছেলে জোয়াল জীবিত আছে। রয়টার্সের সাংবাদিক সাহানা বাজরাচারিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমেই তিনি ছেলের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারেন।
সাহানা নুয়াকোটের ১৫ শয্যার চক্রদেব হাসপাতালে গিয়ে জোয়ালের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। উন্নত চিকিৎসার জন্য জোয়ালকে কাঠমান্ডুতে নেওয়ার আগে পরিবারের সন্ধান পাওয়ার আশায় সাংবাদিকের সঙ্গে ভিডিওতে নিজের পরিচয় দিতে রাজি হয় সে।
হাসপাতালে নিজের ফোন নম্বর রেখে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর তামাং ওই সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জোয়াল জীবিত আছে এবং তাকে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়েছে এ কথা জানার পরও প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তিনি।
রয়টার্সকে তামাং বলেন, সাংবাদিক যখন তাকে জোয়ালের অবস্থান সম্পর্কে জানান, তখন কথাটি বাস্তব মনে হচ্ছিল না। কারণ তিনি ইতোমধ্যে ধরে নিয়েছিলেন, সন্তানদের আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না।
এরই মধ্যে ছোট ছেলেকেও জীবিত অবস্থায় খুঁজে পান তামাং। বড় ছেলেকে ফিরে পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, বড় ছেলেকে পাওয়ার পর মনে হয়েছে, যেন তার জীবনটাও ফিরে এসেছে।
কয়েক মিনিটেই বদলে যায় পুরো এলাকা
বন্যার দিন সকালে দুই ভাই স্কুলের গাড়িতে করে স্কুলে যায়। আর তামাং তখন বাড়িতে তাঁত বুনছিলেন। হঠাৎ ভূমিকম্পের মতো একটি বিকট শব্দ শুনতে পান তিনি।
রয়টার্সের যাচাই করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওতে দেখা যায়, লাংটাং লিরুং পর্বতের কাছে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে উপত্যকার দিকে নেমে আসে। এর ফলে বরফ ও পাথরের ধসের পাশাপাশি ব্যাপক ভূমিধস সৃষ্টি হয় এবং ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়।
তামাং বলেন, তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন সবকিছু পানিতে ভেসে যাচ্ছে। তার মনে হয়েছিল, সন্তানরাও হয়তো পানির স্রোতে ভেসে যাচ্ছে।
তিনি দ্রুত স্কুলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। স্বাভাবিক সময়ে বাড়ি থেকে গাড়িতে স্কুলে যেতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু সেদিন চারপাশের দৃশ্য এতটাই বদলে যায় যে স্কুলটি কোথায়, সেটিই বুঝতে পারছিলেন না তিনি।
কোথায় স্কুল, কোথায় বাজার কিছুই বোঝার উপায় ছিল না। চারদিকে শুধু পানি, পাথর ও কাদা।
ভূমিধসের সঙ্গে নেমে আসা পানি ও ধ্বংসাবশেষ উত্তর নেপাল পেরিয়ে তিব্বতের দিকেও ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিস্তীর্ণ এলাকার বসতি ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়ে যায়।
হাতে ছিল ২০ রুপি
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে রয়টার্সের সাংবাদিকরা হাসপাতালে জোয়ালের সঙ্গে কথা বলেন। তার ডান পা ভাঙা এবং মুখে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তবে বাঁ হাতে সে শক্ত করে ধরে রেখেছিল ১০ রুপির দুটি নোট।
কর্তৃপক্ষ জানায়, তাকে উদ্ধার করা পুলিশ সদস্যরা হাসপাতালে যেতে রাজি করানোর জন্য ওই ২০ রুপি দিয়েছিলেন।
জোয়াল জানায়, বন্যার সময় সে স্কুলে পড়াশোনা করছিল। হঠাৎ চারপাশ ‘খুব, খুব অন্ধকার’ হয়ে যায়। এরপর এক বন্ধুর সঙ্গে স্কুল থেকে জঙ্গলে পালিয়ে গিয়ে একটি গাছে উঠে আশ্রয় নেয়।
ভয় পেয়েছিল কি না জানতে চাইলে মাথা নেড়ে সে বলে, ‘না।’
অবশেষে মায়ের সঙ্গে দেখা
শুক্রবার কাঠমান্ডুর হাসপাতালে ছেলের কাছে পৌঁছান তামাং। তাদের বাড়ি থেকে হাসপাতালটি যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। বন্যার কারণে বাস চলাচল বন্ধ থাকায় রয়টার্সের সাংবাদিকের উদ্যোগে তার জন্য একটি গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়।
জোয়ালের বাবা জাপানে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। ছেলের বেঁচে থাকার খবর পাওয়ার পর তিনিও কাঠমান্ডুর উদ্দেশে রওনা হয়েছেন বলে জানান তামাং।
রাসুয়ার ভয়াবহ বন্যা মুহূর্তের মধ্যেই অসংখ্য মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। ধ্বংসস্তূপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর সন্তানকে ফিরে পেয়ে স্বস্তি পেয়েছেন তামাং।
হাসপাতালের বিছানায় ছেলের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, জোয়াল সবসময়ই দুষ্টু ছেলে। তবে এবারই প্রথম তার কোনো হাড় ভাঙল।
সূত্র: রয়টার্স
-স্বাধীন/এমএ
স্কুল ভেসে গেছে, গাছে উঠে প্রাণে বাঁচল ৮ বছরের জোয়াল

