নেপালে জলবিদ্যুৎ টানেলে আটকা ৯ শতাধিক মানুষ, চলছে উদ্ধার অভিযান

প্রকাশঃ Aug 31, 2026 - 19:07
নেপালে জলবিদ্যুৎ টানেলে আটকা ৯ শতাধিক মানুষ, চলছে উদ্ধার অভিযান

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর নেপালের ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ৯০০ জনের বেশি মানুষ আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে টানেলের প্রবেশমুখে জমে থাকা কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।

সোমবার (৩১ আগস্ট) নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো থেকে ৯৩৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

গত বুধবার হিমালয় থেকে বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের ভয়াবহ স্রোত নেমে এসে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এতে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯১৯ জনে পৌঁছেছে। সীমান্তের তিব্বত অংশে আরও ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। নেপালে এখনো ৪ হাজার ২৪৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক। তিব্বতে নিখোঁজের সংখ্যা আরও ৫৪৬।

উদ্ধারকারী দলগুলোর প্রকাশ করা ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে টানেলের মুখে জমে থাকা কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা চলছে। নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানান, বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ টানেলের ভেতরে ঢুকে পড়ায় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

রেসকিউ দলের সদস্য আশিস গুরুং জানান, টানেলের ভেতরের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। কোথাও কোথাও কাদার গভীরতা বুক পর্যন্ত পৌঁছেছে। রোববার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি রুস্বানার চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিল তার দল।

টানেলের ভেতরে কাদার গভীরতা মাপতে পর্বতারোহীরা কাঠের তক্তা ব্যবহার করেন। পরে সেগুলো দিয়ে অস্থায়ী সেতুও তৈরি করা হয়। উদ্ধারকারীদের নিরাপত্তায় দড়ির ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

গুরুং জানান, তারা টানেলের প্রায় ১৩০ মিটার ভেতর পর্যন্ত যেতে সক্ষম হন। এরপর আরও ভেতরে মরদেহের মতো কিছু দেখতে পান তারা।

তবে জলবিদ্যুৎ কোম্পানির দেওয়া নকশায় টানেলের ভেতরে কয়েকটি নিরাপদ স্থানের কথা উল্লেখ রয়েছে। উদ্ধারকারীরা মনে করছেন, সেখানে আটকে পড়া ব্যক্তিরা আশ্রয় নিয়ে এখনো বেঁচে থাকতে পারেন।

গুরুং বলেন, ‘ভেতরে তাদের জন্য একটি নিরাপদ জায়গা রয়েছে। তাদের কেউ কেউ হয়তো এখনো জীবিত আছেন। আমি আশা করছি, তারা বেঁচে আছেন।’

শুক্রবার থেকে বৈরী আবহাওয়া ও নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় কয়েক দফা উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখতে হয়েছে। নেপাল-চীন সীমান্তে দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট একটি হ্রদ উপচে পড়ায় নদীগুলোতে ফের বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে সোমবার আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় উদ্ধারকাজ আবারও গতি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন রাসুয়া জেলার প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই ঘটনাকে নজিরবিহীন ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম ভূখণ্ড এবং অব্যাহত ঝুঁকির মধ্যেও উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

শাহ জানান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে প্রায় ২১ হাজার নিরাপত্তাকর্মীর পাশাপাশি বেসামরিক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরাও অংশ নিচ্ছেন।

এর আগে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছিল নেপাল। তবে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল থেকে আটকে পড়াদের উদ্ধারে প্রতিবেশী ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, বেইজিং ২ হাজার ১০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে। ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান বরাদ্দ করা হয়েছে। সম্মুখসারির উদ্ধারকারীদের কাছে বিমান থেকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ত্রাণসামগ্রীও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নিখোঁজদের সন্ধানে চীনা সেনারা জীবন শনাক্তকারী বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন।

রেড ক্রসের হিসাবে, এই দুর্যোগে নেপালে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

এদিকে দুর্যোগটির সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা থেকেই এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হতে পারে। তিব্বত মালভূমিতে এ ধরনের ‘ক্রায়োস্ফিয়ার দুর্যোগ’ নতুন ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি হয়ে উঠছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় তথ্য ভাগাভাগি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্সকে নেপালের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি বছরের শুরুতে সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে বৈঠকের পরও হিমবাহের ঝুঁকি ও পানির স্তর নিয়ে চীন খুব বেশি তথ্য দেয়নি। তাদের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি ভবিষ্যতে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিতে বাধা তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে বন্যায় ভেসে যাওয়া অনেক মরদেহ এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। হিমালয়ের বিভিন্ন এলাকায় সেগুলো অগভীর কবরে দাফন করা হচ্ছে। উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

-স্বাধীন/এমএ

নেপালে জলবিদ্যুৎ টানেলে আটকা ৯ শতাধিক মানুষ, চলছে উদ্ধার অভিযান
লোগো
Aug 31, 2026

নেপালে জলবিদ্যুৎ টানেলে আটকা ৯ শতাধিক মানুষ, চলছে উদ্ধার অভিযান

লোগো
বিস্তারিত কমেন্টে
shadhindiganta.com
/ Shadhin Diganta