বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসনে চট্টগ্রামে নতুন মডেলে কাজ শুরু: অর্থমন্ত্রী
চট্টগ্রাম মহানগরীতে বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসন ও জনদুর্ভোগ কমাতে নতুন মডেলে কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নগরীর পতেঙ্গার ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এ উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়েছে। এর ফলে ওই এলাকার পানি সংকট অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে নগরীর হোটেল রেডিসন ব্লু’র একটি হলরুমে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর পানি সরবরাহ সেবার মান উন্নয়নে নতুন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আয়োজিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
এ উদ্যোগের আওতায় চট্টগ্রাম ওয়াসা, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড যৌথভাবে কাজ করবে। প্রতিষ্ঠান তিনটির মধ্যে তিন বছর মেয়াদি একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন এবং বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ইয়ান ভ্যান ডার লিন্ডেনের উপস্থিতিতে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের পানি সরবরাহ পরিস্থিতি তুলে ধরেন ইসরাফিল খসরু। চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. এটিএম তারিকুল ইসলাম এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ামিন ফারুক নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের পানি ও জলবায়ু বিষয়ক প্রথম সচিব ইজে ক্রুজেন এতে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
এই উদ্যোগে নেদারল্যান্ডস দূতাবাস আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, জনগণের কাছে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ খাবার পানি পৌঁছে দেওয়া সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। সেই লক্ষ্যেই নগরীর প্রান্তিক অঞ্চলের উত্তর পতেঙ্গা ও দক্ষিণ পতেঙ্গায় নতুন এই পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে সব কাজ সরকারের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংকট সমাধানে একটি কার্যকর মডেল তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
আমির খসরু বলেন, বর্তমান সময়ে অর্থনীতির কাঠামো ও কার্যক্রমের ধরন অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। আগে অধিকাংশ কাজ সরকার একাই করত। এখন সরকারি সেবা আরও কার্যকরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশীদারিত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, অর্থনীতির পুরো মডেলেই নতুন পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে। আগে যেখানে সীমিত কয়েকটি উৎস থেকে অর্থায়ন করা হতো, এখন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। এই মডেলে সরকার, বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলো সম্মিলিতভাবে কাজ করবে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর কোনো প্রকল্পের জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার অনেক সময় প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও পরবর্তী সময়ে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোর কার্যকারিতা কমে যায়। নতুন মডেলে এ বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি বর্ষাকালে চট্টগ্রাম নগরীর পানি নিষ্কাশন সমস্যাকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মকর্তারা জানান, সমঝোতা স্মারকের আওতায় তিনটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জন্য একটি উদ্ভাবনী সরকারি-বেসরকারি পানি সরবরাহ মডেল নিয়ে কাজ করবে। প্রাথমিকভাবে ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের পানির চাহিদা নিরূপণ এবং সেখানে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হবে।
চট্টগ্রাম ওয়াসা, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের মধ্যে এটি এ ধরনের প্রথম আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নতুন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।
চলতি বছরের মে মাসে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের (ম্যাক্স ট্যাপওয়াটার) পরিচালিত একটি সমীক্ষার পর এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়।
সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের ১ লাখ ৬৪ হাজার ৯৯ জন বাসিন্দার নিরাপদ খাবার পানি পাওয়ার সুযোগ সীমিত। এসব এলাকার মাত্র ২০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়িতে চট্টগ্রাম ওয়াসার পাইপলাইন নেটওয়ার্ক রয়েছে।
সমীক্ষায় আরও উঠে এসেছে, দুই ওয়ার্ডের অধিকাংশ বাসিন্দা বর্তমানে স্থানীয়ভাবে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ৮৫ থেকে ১১০টি বেসরকারি ভেন্ডরের কাছ থেকে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ লিটার পানি কিনছেন। এ পরিমাণ পানির জন্য তাদের ২৫ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।
এ ছাড়া এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার মাত্রাও অনেক বেশি। পরীক্ষায় পানিতে সর্বোচ্চ ৩ হাজার পিপিএম পর্যন্ত লবণাক্ততা পাওয়া গেছে, যেখানে জাতীয়ভাবে নিরাপদ সীমা ১ হাজার পিপিএম।
-স্বাধীন/এমএ
বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসনে চট্টগ্রামে নতুন মডেলে কাজ শুরু: অর্থমন্ত্রী

