রেমা-কালেঙ্গার গহিন বনে দেখা মিলল ‘দৈত্য’ কাঠবিড়ালির

প্রকাশঃ Sep 7, 2026 - 19:48
রেমা-কালেঙ্গার গহিন বনে দেখা মিলল ‘দৈত্য’ কাঠবিড়ালির

দীর্ঘ লেজ ও বিশাল শরীরের বিরল মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলের ছবি তুলেছেন বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী

ঘন সবুজের আড়ালে যেন লুকিয়ে আছে অন্য এক জগত। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ছে মাটিতে। চারপাশে নীরবতা। সেই নীরবতার মধ্যেই হঠাৎ উঁচু গাছের ডালে চোখে পড়ে অস্বাভাবিক বড় একটি কাঠবিড়ালি। দীর্ঘ লেজ আর বিশাল শরীর নিয়ে ডাল থেকে ডালে ছুটে বেড়াচ্ছে প্রাণীটি।

এমনই এক বিরল দৃশ্য ধরা পড়েছে হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের গহিন অরণ্যে।

প্রাণীটি সাধারণ কাঠবিড়ালি নয়। এটি মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেল—বাংলাদেশে পাওয়া কাঠবিড়ালি প্রজাতিগুলোর মধ্যে অন্যতম বড়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Ratufa bicolor।

সম্প্রতি অভয়ারণ্যের গভীর বনে বিরল এই প্রাণীটির ছবি তুলেছেন শৌখিন বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী শাহেদ আহমেদ। ছবিটি প্রকাশ্যে আসার পর প্রকৃতিপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ ও আনন্দ।

আকারেই আলাদা

মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এর বিশাল আকার। পূর্ণবয়স্ক একটি প্রাণীর শরীরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এর লেজও প্রায় শরীরের সমান লম্বা। ফলে মাথা থেকে লেজের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত মোট দৈর্ঘ্য এক মিটারেরও বেশি হতে পারে। ওজন প্রায় দুই কেজি পর্যন্ত হওয়ার তথ্যও রয়েছে।

কালো, বাদামি কিংবা লালচে-মেরুন রঙের শরীর এবং ঘন, ঝোপালো লেজ প্রাণীটিকে অন্য কাঠবিড়ালি থেকে সহজেই আলাদা করে। গাছের মগডালে দ্রুত চলাচলের সময় লম্বা লেজটি ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গাছই যার ঘর

মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলের জীবন অনেকটাই গাছকেন্দ্রিক। সাধারণত মাটিতে খুব কম নামে। বড় ও পুরোনো গাছের ডালপালায় বিচরণ করে এবং উঁচু গাছে পাতা ও ডাল দিয়ে বাসা তৈরি করে। বুনো ফল, বীজ, বাদাম ও গাছের কচি পাতা এর প্রধান খাদ্য।

এ কারণে এই প্রাণীর অস্তিত্বের সঙ্গে রেমা-কালেঙ্গার পুরোনো প্রাকৃতিক বনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বড় গাছের সংখ্যা কমে গেলে শুধু এই কাঠবিড়ালিই নয়, আরও অনেক বৃক্ষনির্ভর প্রাণী খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকটে পড়তে পারে।

বিরল প্রাণীর দেখা, বন রক্ষার তাগিদ

বন উজাড়, পুরোনো বৃক্ষ নিধন, মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ও অবৈধ শিকারসহ নানা কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে। তাই বিরল এই কাঠবিড়ালির দেখা পাওয়া যেমন আনন্দের, তেমনি এটি বন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়।

কালেঙ্গা বিট কর্মকর্তা আল আমিন বলেন, রেমা-কালেঙ্গায় মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলের উপস্থিতি বনের জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের বিরল প্রাণীর অস্তিত্ব প্রমাণ করে, অভয়ারণ্যটি এখনো বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে টিকে আছে। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্থানীয়দের সহযোগিতা প্রয়োজন।

হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সুবাস চন্দ্র দেব বলেন, বড় ও পুরোনো গাছ সংরক্ষণ ছাড়া জায়ান্ট স্কুইরেলের মতো প্রাণীকে টিকিয়ে রাখা কঠিন। গহিন বন ও প্রবীণ বৃক্ষ কমে গেলে এসব প্রাণী একই সঙ্গে খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয় হারাবে।

বন্যপ্রাণী প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, রেমা-কালেঙ্গায় বিরল মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলের দেখা পাওয়া নিঃসন্দেহে সুখবর। বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সচেতন নাগরিকদের সহযোগিতাও প্রয়োজন।

রেমা-কালেঙ্গার সবুজ অরণ্যে বিরল এই কাঠবিড়ালির উপস্থিতি প্রকৃতিপ্রেমীদের আনন্দিত করেছে। তবে এই আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বড় একটি দায়িত্বও। কারণ ‘দৈত্য’ এই কাঠবিড়ালির প্রকৃত নিরাপত্তা ক্যামেরার ছবিতে নয়—নিরাপদ, অক্ষত ও সবুজ অরণ্যের মধ্যেই।


-স্বাধীন/ এস

রেমা-কালেঙ্গার গহিন বনে দেখা মিলল ‘দৈত্য’ কাঠবিড়ালির
লোগো
Sep 7, 2026

রেমা-কালেঙ্গার গহিন বনে দেখা মিলল ‘দৈত্য’ কাঠবিড়ালির

লোগো
বিস্তারিত কমেন্টে
shadhindiganta.com
/ Shadhin Diganta